ক্ষুদ্রঋণ গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে আর্থিক চাপে পড়ছে বহু দরিদ্র পরিবার। বিশেষ করে দরিদ্রতম পরিবারগুলোর আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় গ্রামীণ ঋণবাজারের এমন চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ ঋণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। গ্রামীণ ঋণের চারটির মধ্যে তিনটিই আসে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। একই সঙ্গে ঋণগ্রহণকারী পরিবারের হার এবং আয়ের তুলনায় কিস্তি পরিশোধের চাপ-দুটিই বেড়েছে।
বিআইডিএসের গবেষক কাজী ইকবালের ‘২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের গ্রামীণ ঋণবাজারের কাঠামোগত রূপান্তর: কে ঋণ দেয়, কী উদ্দেশ্যে, কোন শর্তে এবং কী ব্যয়ে (২০০০-২০২২)’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের সম্মেলনকক্ষে ‘বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়ন: প্রমাণ ও নীতিসংলাপ’ শীর্ষক কর্মশালায় গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করা হয়।
কিস্তির চাপে দরিদ্রতম পরিবার
গবেষণায় দেখা গেছে, ঋণ নেওয়া গ্রামীণ পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। মাসিক আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করেন-এমন ঋণগ্রহীতার হার ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৯ শতাংশ হয়েছে।
ঋণদাতাভেদে সুদের হারেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের সুদের হার ১০ শতাংশ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ঋণে ফ্ল্যাট সুদের হার ১৫ শতাংশ এবং মহাজনি ঋণের সুদের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ।
গবেষক কাজী ইকবাল বলেন, মূলত ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। তিনি জানান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ঋণে ১৫ শতাংশ ফ্ল্যাট সুদের কার্যকর হার প্রায় ২৭ শতাংশ।
তিনি বলেন, মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া অনেক পরিবার একই সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকেও ঋণ নেয়। গত এক দশকে এমন পরিবারের হার ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন মেটানো এবং কিস্তি পরিশোধের অর্থের ঘাটতি পূরণ করতে এসব পরিবার মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে।
কৃষিঋণের কিস্তিতে মৌসুমের সামঞ্জস্য জরুরি
গবেষণায় বলা হয়েছে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কৃষিঋণে সাপ্তাহিক কিস্তির পরিবর্তে মাসিক কিস্তির প্রচলন বেড়েছে। তবে কৃষি মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হলেও তা স্থায়ী হয়নি। ফলে কৃষকের আয় আসার সময়ের সঙ্গে কিস্তি পরিশোধের সময়সূচির সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
কাজী ইকবাল বলেন, গ্রামীণ ঋণে কৃষির অংশ কমেছে। তবে কৃষিকাজের জন্য নেওয়া ঋণের বড় অংশ ব্যয় হয় সার, বীজ, গবাদিপশু কেনা এবং নগদ অর্থে জমি ইজারা নেওয়ার কাজে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দরিদ্রতম পরিবারগুলোর মধ্যে কিস্তির চাপে থাকা পরিবারের হার ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৯ শতাংশ হওয়া উদ্বেগজনক। ঋণের শর্ত, সুদের প্রকৃত ব্যয় এবং পরিবারের আয় আসার সময় বিবেচনায় না নিলে ঋণ দরিদ্র পরিবারের আর্থিক চাপ আরো বাড়াতে পারে।
পরিবার পর্যায়ে ঋণের চাপ পরিমাপের তাগিদ
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি পরিবার পর্যায়েও ঋণের চাপ পরিমাপ করা প্রয়োজন। পরিবারের আয় ও সম্পদের তুলনায় ঋণের পরিমাণ কত, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ততা বাড়লে একসময় ঋণগ্রহীতাদের পক্ষে কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণ কার্যক্রম ও আর্থিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্রঋণের সর্বোচ্চ সেবামাশুল ২৪ শতাংশ নির্ধারিত। তবে সব প্রতিষ্ঠানকে এই হারে সেবামাশুল নিতে হয় না। প্রতিযোগিতা বাড়লে সেবামাশুল কমার কথা থাকলেও প্রতিযোগিতার ঘাটতির কারণে তা কমছে না।
কৃষকের সহায়তায় কৃষক কার্ড
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের সহায়তায় ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে।
তিনি জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে একজন কৃষক ১০টি মৌলিক সেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ, প্রণোদনা হিসেবে সার ও বীজ, আবহাওয়া বার্তা এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শ।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে কৃষি সচিব বলেন, একদিকে কাঁচামরিচের দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকা হলে ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়ে, অন্যদিকে উৎপাদন মৌসুমে টমেটোর দাম কেজিপ্রতি দুই টাকায় নেমে এলে কৃষকরা তা রাস্তায় ফেলে দিতে বাধ্য হন।
তিনি আরো বলেন, আলুর উদ্বৃত্ত উৎপাদন হলেও দেশে এখনো পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল কিংবা উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেনি। তবে এবার দেশে পেঁয়াজ আমদানি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে পেঁয়াজ, টমেটো ও কাঁচামরিচ উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়ন নিয়ে আরো তিন গবেষণা
কর্মশালায় আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তিনটি গবেষণাও উপস্থাপন করা হয়। গবাদিপশু খাতে অর্থায়ন ও ঝুঁকি ভাগাভাগি নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন গবেষক কেট অ্যাম্বলার। কৃষিযন্ত্র ও কৃষিসেবা খাতে অর্থায়নবিষয়ক গবেষণা উপস্থাপন করেন মেহরাব বখতিয়ার। আর শহরের পথখাবার বিক্রেতাদের অর্থায়ন নিয়ে গবেষণাপত্র তুলে ধরেন কার্লি ট্র্যাচটম্যান।
সানা/আপ্র/১৩/১০/২০২৬