রাজনৈতিক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় অতিক্রম করে যে নতুন সূচনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সরকার পথচলা শুরু করেছে, সেই সূচনার প্রভাতেই যেন নেমে এসেছে দামের দহন। এই দহন কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও ন্যূনতম নিরাপত্তার ওপর নেমে আসা এক নির্মম বাস্তবতা। কম ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন বিপুলসংখ্যক মানুষ আজ এমন এক প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে, যেখানে তাদের জীবন-জীবিকা ধীরে ধীরে এক দীর্ঘ, অনিশ্চিত অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কায় কাঁপছে।
জ্বালানি তেলের পরপরই তরলীকৃত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, তা বহুমাত্রিক ও গভীর। রান্নার চুলার আগুন থেকে শুরু করে কৃষিক্ষেতের সেচযন্ত্র, শহরের গণপরিবহন থেকে শিল্পকারখানার উৎপাদন-সবখানেই এই মূল্যবৃদ্ধির ছায়া পড়েছে। ফলে বাজারে প্রতিটি পণ্যের দামে যুক্ত হচ্ছে নতুন এক অদৃশ্য বোঝা, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে ক্লান্ত মানুষ আরো এক দফা সংকটে পড়েছে।
সরকারের যুক্তি-আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এই সিদ্ধান্তকে অনিবার্য করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা একটি ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি জনমনে সন্দেহ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনস্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে তা আস্থার সংকটে রূপ নিতে পারে।
এই দ্বৈত বাস্তবতা-একদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতার যুক্তি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দামের পতনের প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধি-নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতার অপরিহার্যতা আরো জোরালো করে তুলেছে। কারণ, অর্থনীতির কঠিন সমীকরণ সাধারণ মানুষ মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে, যদি তারা বিশ্বাস করে যে সিদ্ধান্তগুলো ন্যায্য, যুক্তিযুক্ত এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যে কেবল একটি খাতের সংকট নয়, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ডিজেলের দাম বাড়ার অর্থ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং শিল্প খাতে চাপ। এর সরাসরি প্রতিফলন ঘটে নিত্যপণ্যের দামে, যা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বেঁচে থাকার সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তোলে। ইতোমধ্যে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, বাজারে অস্থিরতা এবং মজুতদারদের তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
সরকার বলছে, প্রকৃত সংকট নয়, বরং কৃত্রিম সংকটই বড় সমস্যা-মজুতদারি ও কালোবাজারি পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করছে। যদি তা-ই হয়, তবে এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, শাসনব্যবস্থারও। বিচ্ছিন্ন অভিযান বা জরিমানায় সাময়িক স্বস্তি মিললেও, স্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে শক্তিশালী নজরদারি, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং কঠোর জবাবদিহিতে।
একই সঙ্গে সংসদে উপস্থাপিত তথ্য-দেশে বিদ্যমান গ্যাস মজুত দিয়ে আরো এক দশকের বেশি সময় চাহিদা মেটানো সম্ভব-একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দূরদর্শী পরিকল্পনা, অনুসন্ধান কার্যক্রমের গতি এবং বিকল্প জ্বালানির উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তব শক্তিতে রূপ নেবে।
নতুন সরকারের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী-একদিকে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া, অন্যদিকে জনআস্থা পুনর্গঠন। অতীতের অভিজ্ঞতায় মানুষ দেখেছে কীভাবে জ্বালানি সংকট, বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি রাষ্ট্রকে অস্থির করে তোলে। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হলে এখনই প্রয়োজন সাহসী, স্বচ্ছ ও মানবিক সিদ্ধান্ত।
জ্বালানির মূল্য সমন্বয় যদি অনিবার্যও হয়, তবে তার অভিঘাত প্রশমনে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, ভর্তুকির কার্যকর ব্যবহার, গণপরিবহন ও কৃষিখাতে বিশেষ সুরক্ষা এবং সর্বোপরি বাজারে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, দামের এই দহন যদি নিয়ন্ত্রণহীন থাকে, তবে তা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, রাজনীতির ভিত্তিকেও দগ্ধ করবে। আর যদি সরকার এই দহনকে সংযম, প্রজ্ঞা ও ন্যায়সংগত নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, তবে এই সংকটই হয়ে উঠতে পারে আস্থা পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
সানা/আপ্র/২১/৪/২০২৬