গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

উত্তমরূপে অজু করার ফজিলত ও সঠিক পদ্ধতি

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৪৮ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫০ এএম ২০২৬
উত্তমরূপে অজু করার ফজিলত ও সঠিক পদ্ধতি
ছবি

ছবি সংগৃহীত

নবীজি (সা.) একবার সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমাদেরকে কি এমন কিছু আমলের কথা বলে দেব না, যে আমলের মাধ্যমে তোমাদের গুনাহ মাফ হবে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই বলুন, ইয়া রাসুলল্লাহ!’ তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, এমন তিনটি আমল রয়েছে, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে আমাদের গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম।এগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো ‘ইসবাগ আলাল মাকারিহ’ অর্থাৎ কখনো হয়তো ঠান্ডার কারণে, অসুস্থতার কারণে অজু করতে কষ্ট হলেও কষ্ট উপেক্ষা করে পরিপূর্ণরূপে অজু করা।

কেউ যদি কষ্ট ‍উপেক্ষা করে পরিপূর্ণ রূপে অজু করে, তাহলে তার গুনাহ মাফ হবে এবং আল্লাহর কাছে মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আর অপর দুটি আমল হলো, মসজিদে বেশি বেশি পায়ে হেঁটে, অর্থাৎ দূরের পথ অতিক্রম করে মসজিদে যাওয়া এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনা; কখন নামাজের সময় হবে এবং কখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সমীপে সালাত নিবেদন করব।নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একবার সাহাবিদের সামনে হাউজে কাউসারের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

এক পর্যায়ে তিনি সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন যে, তিনি হাউজে কাউসার থেকে তাঁর উম্মতকে পানি পান করাবেন। অর্থাৎ যারা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্নাহ অনুসরণ করেছেন এবং বেদাত থেকে দূরে থেকেছেন, কেয়ামতের সেই ভয়াবহতম দিনে যখন সবাই তৃষ্ণার্ত থাকবে, তখন তিনি তাদেরকে হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করাবেন। তখন সাহাবিরা প্রশ্ন রাখেন, ‘ইয়া রাসুলল্লাহ, আপনি আমাদের কিভাবে চিনবেন? অর্থাৎ আপনি আপনার উম্মতের সবাইকে কিভাবে অন্যদের থেকে আলাদা করবেন এবং চিনবেন?’ তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা যে অজু করছ, সেই অজুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল থাকবে, জ্বলজ্বল করতে থাকবে।

এটি দেখে আমি আমার উম্মতকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পারব।এই হাদিস থেকেও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, কেয়ামতে নবীজির (সা.) হাতে হাউজে কাউসারের পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য আমাদেরকে যা করতে হবে, তা হলো দুনিয়াতে উত্তমরূপে অজু করা। তাহলে অজুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল হবে, আমরা অন্যদের থেকে পৃথক হতে পারব এবং নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মতের একজন সদস্য হিসেবে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হতে পারব। এরকম আরও বহু হাদিস আছে, যে হাদিসগুলোতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিভিন্ন আমলের ফজিলত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অজুর নির্দেশ দিয়েছেন এবং আলাদা করে ‘ইসবাগ’ বা উত্তমরূপে অজু করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সবগুলো কথার নির্যাস ও সারাংশ হলো, অজু তো করতে হবেই, কিন্তু সেই অজু যেন উত্তম হয়, পরিপূর্ণ হয়; এ বিষয়ে বিশেষভাবে যত্নশীল হতে হবে।উত্তমরূপে অজু করার সঠিক পদ্ধতি১. অজুর অঙ্গগুলোর কোনো অংশ শুকনো না থাকাউত্তমরূপে অজু বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে? এ সম্পর্কে বিশ্ববিখ্যাত হাদিস ব্যাখ্যাকার মোল্লা আলী কারী (রহ.) ‘মিরকাতুল মাফাতিহ’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, উত্তমরূপে অজু করার মানে হলো অজুর ফরজ ও সুন্নাহ সবগুলোকে যথাযথভাবে আদায় করা। অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেভাবে অজু করেছেন, ঠিক সেভাবে অজু করা। প্রত্যেকটা ফরজ, প্রত্যেকটা সুন্নাহ, প্রত্যেকটা মুস্তাহাব, প্রত্যেকটা রোকন—সবকিছুকে সর্বোচ্চ উত্তমভাবে এবং যথাযথভাবে যেভাবে করতে বলা হয়েছে, ঠিক সেভাবে তা আদায় করা।

এটিই হলো মূলত অজু সুন্দর করার অর্থ।অজু সুন্দর করার আরেকটি ব্যাখ্যা আমরা হাদিস থেকেই পাই। সেটি সহিহ মুসলিমে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একবার নবী করিমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সামনে এক ব্যক্তি অজু করে এলেন এবং লোকটার অজুর অঙ্গের কোথাও এক নখের জায়গা সমপরিমাণ অংশ শুকনো ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার এই শুকনো জায়গা দেখে লক্ষ্য করে তাকে বললেন, ‘তুমি যাও, আবার অজু করো এবং অজু যেন সুন্দর হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে।’ এই হাদিস থেকে বোঝা গেল যে, অজু সুন্দর করার অর্থ হলো অজুর অঙ্গগুলোকে উত্তমরূপে ধৌত করা, যাতে কোথাও কোনো অংশ শুকনো না থাকে।প্রায় একই বিষয়ে আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সেটি হলো, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের পায়ের গিরা এবং গোড়ালিগুলোকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাবে।’

অর্থাৎ এগুলো যদি শুকনো থাকে, এগুলোতে যদি অজুর পানি না পৌঁছে, তবে সেটি জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, পায়ের গিরা, গোড়ালি বা শরীরের যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শুকনো থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেগুলোকে উত্তমরূপে ডলে ধুতে হবে, যাতে সেখানে পানি পৌঁছে যায় এবং তা ভালোভাবে ভিজে যায়। এটি হলো অজু উত্তমরূপে করার অন্যতম অর্থ।২. পানি অপচয় না করাউত্তমরূপে অজু করার আরেকটি দিক হলো অজুতে পানির অপচয় না করা। কলের নিচে অজু করলে আমরা যেন কল ছেড়ে রেখে ব্রাশ করতে না থাকি, অযথা পানি নষ্ট না করি। হয়তো আপাতদৃষ্টিতে আমাদের পানির কোনো অভাব নেই, কিন্তু আমরা যতটুকু পানি অপচয় করব, তার জন্য কখনো না কখনো সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, অপচয় করতে স্পষ্টভাবে কোরআন এবং হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। তাই অজুর মতো একটি পবিত্র ইবাদত করতে গিয়েও যেন আমরা কল ছেড়ে রেখে বা বিভিন্নভাবে অহেতুক পানি নষ্ট না করি।অজুকে পরিপূর্ণ এবং উত্তমরূপে করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অজুতে মেসওয়াক করা। কারণ, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে অজুতে মেসওয়াক করার নির্দেশ দিয়েছেন। আজকাল আমরা বেশিরভাগ মানুষই অজুতে মেসওয়াক করি না, আমরা অনেকেই সাথে মেসওয়াক রাখিও না। অথচ নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনের সর্বশেষ আমল ছিল এই মেসওয়াক। তিনি মেসওয়াক করতে করতেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন এবং অজুতে মেসওয়াকের আলাদা নির্দেশ দিয়েছেন। মেসওয়াকের সাথে আমাদের ইমানের গভীর সম্পর্ক আছে, মৃত্যুর সাথেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। 

এ জন্য যথাসাধ্য আমাদের মেসওয়াক করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। বিশেষ করে অজুর সময় যদি আমরা মেসওয়াক করি, তাহলে যেভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অজু করতে বলেছেন, সেভাবে অজু করার বিষয়টি আমাদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে এবং আমরা উত্তমরূপে অজু করার সেই কাঙ্ক্ষিত আমলটি করতে পারব।৩. প্রস্রাব বা বায়ুর বেগ চেপে জোর করে অজু ধরে না রাখাউত্তমরূপে অজু করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চাপাচাপি করে অজু ধরে না রাখা। অর্থাৎ কখনো এমন হতে পারে, অজু করে মাগরিবের নামাজ পড়ার পর আমি ভাবলাম, এই অজু দিয়েই ইশার নামাজ আদায় করবো; প্রস্রাবের কিংবা বায়ুর বেগ চেপে রেখে ইশার নামাজ শেষ করার পর ওয়াশরুমে যাব—এটি একটি অনুত্তম কাজ।

এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো নয়, আবার আমাদের তাকওয়ার জন্যও ভালো কিছু নয়। বরং অলসতা না করে উত্তমরূপে অজু করতে হবে। বিশেষ করে শীতের দিনে আমরা অনেকে কোনো রকম যেনতেনভাবে পানি দিয়ে অজু সারার চেষ্টা করি, এটি যেন না হয়। অজুর অঙ্গগুলো যেন উত্তমরূপে ধোয়া হয়, আবার সে ক্ষেত্রে পানি যেন অপচয় না হয়, অজুতে যেন মেসওয়াক করা হয় এবং সেই সঙ্গে বেগ চেপে রেখে কষ্ট করে অজু ধরে না রাখা হয়। তাহলে আমাদের অজু উত্তম বা সুন্দর অজু গণ্য হবে।

এসি/আপ্র/২৫/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

মসজিদের দরজা বন্ধ থাকলেও বারান্দা থেকে নামাজ আদায় বৈধ
২৫ অক্টোবর ২০২৬

মসজিদের দরজা বন্ধ থাকলেও বারান্দা থেকে নামাজ আদায় বৈধ

গরমের সময় অনেক মসজিদে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালানোর কারণে ভেতরের দরজা বন্ধ রাখা হয়। এ অবস্থায় ঠান্ড...

সৎকর্মের মাঝেই প্রশান্তি নিহিত
২৩ অক্টোবর ২০২৬

সৎকর্মের মাঝেই প্রশান্তি নিহিত

ইসলাম===

শারদীয় দুর্গাপূজার আজ মহানবমী, বিদায়ের সুর দেবীর
২০ অক্টোবর ২০২৬

শারদীয় দুর্গাপূজার আজ মহানবমী, বিদায়ের সুর দেবীর

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আজ মহানবমী। পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি নিবেদন, প...

মহাঅষ্টমীতে পূজামণ্ডপে ভক্তদের ঢল
১৯ অক্টোবর ২০২৬

মহাঅষ্টমীতে পূজামণ্ডপে ভক্তদের ঢল

ছয় দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গাপূজার তৃতীয় দিনে আজ সারাদেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে ‘মহাঅষ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই