গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মেনু

দূরের যুদ্ধে ঘরের সংকট

তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কমছে আয়, অনিশ্চয়তার ছায়ায় বিশ্ব অর্থনীতি

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২১:১২ পিএম, ১৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ০৪:১৩ এএম ২০২৬
তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কমছে আয়, অনিশ্চয়তার ছায়ায় বিশ্ব অর্থনীতি
ছবি

পাম্পে তেল নেওয়ার জন্য বহুদূর থেকে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি যেন নীরব প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মিছিল -ছবি সংগৃহীত

বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর সংঘাতে আবারো সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে জ্বালানি অস্থিরতা। তার সরাসরি ধাক্কা এসে পড়েছে বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশগুলোর মানুষের জীবনে।
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে পণ্য পৌঁছে দেন শাকিল খান। কখনো আবার যাত্রীও বহন করেন। কিন্তু এখন তার দিন শুরু হচ্ছে কাজ দিয়ে নয়, বরং পেট্রোল পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও একসঙ্গে বেশি তেল পাচ্ছেন না। কারণ জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়ায় সরকার সীমা নির্ধারণ করেছে।
শাকিল খান বলেন, পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় আমার দৈনিক আয় কমে গেছে। যখন তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এই কথা বলছিলেন, তখন তার পেছনে ছিল মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি-যেন নীরব প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মিছিল। আরেক চালক রাইসুল ইসলাম বলেন, “আমাকে দিনে দুবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সকালে একবার, আবার সন্ধ্যায় একবার তেল কিনতে আসতে হয়। এভাবে চলা সম্ভব নয়।”
যুদ্ধের আগুনে স্থবির হরমুজ প্রণালি: ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার জেরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ-হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের আকাশে এখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উপস্থিতি নিয়মিত দৃশ্য। বিশ্বের তেল সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশসহ এশিয়ার বহু দেশ আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তাই যুদ্ধের প্রভাব পড়তেই এসব দেশে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জয়নাল বলেন “পরিস্থিতি যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি হবে। আমরা খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে যাব।”


কোটি কোটি ডলার ব্যয়, তবু বাড়ছে অনিশ্চয়তা: একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৮৯ কোটি ডলার। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে মানুষকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কম ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনে বাতি না জ্বালানো এবং সম্ভব হলে বাসা থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা তাদের মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থাটির ইতিহাসে এত বড় পরিমাণ তেল ছাড়ার ঘোষণা আগে কখনো দেওয়া হয়নি।

সতর্ক করছে জাতিসংঘ: যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে চাপ: ইরান যুদ্ধ এমন সময় শুরু হয়েছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি আগে থেকেই নানা অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ অঞ্চলটির দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারতের গোরখপুর শহরের বাসিন্দা অজয় কুমার ভোর তিনটায় গ্যাস সিলিন্ডারের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘দশ দিন ধরে এ অবস্থা চলছে। আগে লাইনে না দাঁড়ালে গ্যাস পাওয়া যায় না। প্রায় অর্ধেক মানুষকে খালি হাতেই ফিরে যেতে হয়।’
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক। দেশটির এলপিজি চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে আমদানি থেকে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। রবি নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। গতকাল আমাদের চুলায় লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়েছে।’
পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সরকার শোধনাগারগুলোকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি শিল্পখাত থেকে জ্বালানি সরিয়ে গৃহস্থালির সরবরাহ সচল রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

পাকিস্তান থেকে থাইল্যান্ড-সবার একই লড়াই: সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তানও নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কিছু ক্ষেত্রে স্কুল বন্ধ রাখা এবং বাসা থেকে অফিসের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ঘোষণা দিয়েছেন, সরকারি দপ্তরগুলো নতুন আসবাবপত্র বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কিনতে পারবে না। দক্ষিণ কোরিয়াও তেলের দামে সীমা নির্ধারণ করেছে, যা গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবার। সরকারি কর্মকর্তাদের তেল শোধনাগার ও গ্যাস স্টেশনগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ড সরকার সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ সফর স্থগিত রেখেছে এবং বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। ফিলিপাইনও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে কিছু সরকারি কর্মকর্তার কার্যদিবস চার দিনে নামিয়ে এনেছে এবং অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও কি মন্দার ঝুঁকিতে? বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দিনের ব্যবধানে তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক থাকবে-তার ওপর নির্ভর করবে অর্থনৈতিক চাপের মাত্রা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সোসাইটির’ জ্যেষ্ঠ গবেষক র‌্যাচেল জিয়েম্বা বলেন,
“যদি তীব্র সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে পণ্যমূল্য ভোক্তাদের জন্য আরো অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে।” শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্যাম ওরির মতে, ইতিহাসে যতবার তেলের দাম অর্থনীতির আকারের তুলনায় দীর্ঘ সময় বেশি ছিল, ততবারই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা-যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
 

সংকটের শেষ কোথায়? বিভিন্ন দেশের সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে-তেল মজুদ ছাড়ছে, ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দিচ্ছে, বিকল্প পথ খুঁজছে। কিন্তু তাতেও মানুষের মনে স্বস্তি ফিরছে না। কারণ একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা- এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? আর সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত হয়তো বিশ্বের বহু শহরে পেট্রোল পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে শাকিল খানের মতো হাজারো মানুষ-যাদের কাছে দূরের যুদ্ধ মানেই নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতা।

আর সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত হয়তো বিশ্বের বহু শহরে পেট্রোল পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে শাকিল খানের মতো হাজারো মানুষ-যাদের কাছে দূরের যুদ্ধ মানেই নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতা।

সানা/আপ্র/১৭/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সীতাকুণ্ডে ছাত্রলীগ নেতাকে নৃশংস কোপ
১৭ মে ২০২৬

সীতাকুণ্ডে ছাত্রলীগ নেতাকে নৃশংস কোপ

আঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি

হাসিনার সময়ে পাওয়া ২০ কোটি টাকার অনুদান ফেরত চায় মহিলা ক্রীড়া সংস্থা
১৬ মে ২০২৬

হাসিনার সময়ে পাওয়া ২০ কোটি টাকার অনুদান ফেরত চায় মহিলা ক্রীড়া সংস্থা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া...

বিলুপ্তির পথে লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যবাহী গিগজ মুড়ি
১৩ মে ২০২৬

বিলুপ্তির পথে লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যবাহী গিগজ মুড়ি

তারেক মাহমুদ, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরে ঐতিহ্যবাহী গিগজ ধানের হাতে ভাজা মুড়ি শতবর্ষের শিল্প...

৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা আনছে সরকার
১৩ মে ২০২৬

৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা আনছে সরকার

জানালেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। আপনি কি মনে করেন- গ্রামীণ ব্যাংক সবচেয়ে চড়া সুদ আদায় করে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে