কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের গতি কমানোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন করে প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইয়ের সাম্প্রতিক আহ্বানকে নিরাপত্তার দিক থেকে যৌক্তিক মনে হলেও এর পেছনে চীনের বিরুদ্ধে ‘স্নায়ুযুদ্ধ কৌশল’ রয়েছে বলে দাবি করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস।
গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক নিবন্ধে আমোদেই আধুনিক এআই মডেলের উন্নয়নের গতি কিছুটা কমিয়ে নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক। আমোদেইয়ের যুক্তি, এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে; কিন্তু এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি সেই তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
তবে একই নিবন্ধে আমোদেই যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের ওপর চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করার এবং চীনা এআই গবেষণাগারগুলোর মাধ্যমে মডেল ডিস্টিলেশন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিলে চীনসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো একই পথে হাঁটবে কি না, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমোদেই বলেন, তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ও কঠিন দ্বিধা হলো- চীন ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হয়তো এআই উন্নয়নের গতি কমাবে না। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস অবশ্য আমোদেইয়ের প্রস্তাবের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটির প্রকৃত লক্ষ্য এআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; বরং প্রযুক্তিগত বাধা ও নিয়ন্ত্রক একচেটিয়া আধিপত্যের মাধ্যমে চীনের এআই উন্নয়ন থামানো, আধুনিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রাখা এবং বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থা থেকে চীনকে বাদ দেওয়া।
গ্লোবাল টাইমসের ভাষ্য, এ ধরনের ‘নীরব এআই স্নায়ুযুদ্ধ কপটতাপূর্ণ ও দূরদর্শিতাবিহীন’। বৈশ্বিক এআই উদ্ভাবন থেকে চীনকে দূরে রাখার চেষ্টা প্রযুক্তিগত ভুল ও সমন্বয়হীনতার ঝুঁকি বাড়াবে এবং এআইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কাও আরো তীব্র করতে পারে বলে মন্তব্য করেছে পত্রিকাটি।
এদিকে এআইয়ের উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার তিনি বলেন, কিছু ‘খুবই নেতিবাচক শক্তি’ এআই নিয়ে অতিরঞ্জিত শঙ্কা ছড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এআই প্রযুক্তিতে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তিনি এই অবস্থান ধরে রাখতে চান। তাঁর বক্তব্য, যে দেশ এআই দৌড়ে জয়ী হবে, বিশ্বে তারই প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকবে।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। অ্যানথ্রপিকের গবেষকদের সতর্কবার্তার পর দ্রুত বিকাশমান এআই ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করতে পারে- এমন আশঙ্কায় নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দাবি উঠেছে।
চীন অবশ্য এআই প্রতিযোগিতাকে সংঘাতের দিকে না নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে এআইয়ের ক্ষেত্রে ‘উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি’ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বিভিন্ন ধরনের হুমকি উসকে দেওয়া, সংঘাতে জড়ানো এবং ক্ষতিকর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া এআইয়ের বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে। এতে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিরোধের মধ্যেই দুই দেশ আধুনিক এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকেও এআই নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার বিষয়টি উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে এআইয়ের দ্রুত বিকাশ যখন অর্থনীতি, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও সামরিক প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তখন একই প্রযুক্তিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা ক্রমেই নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে। ফলে এআইয়ের উন্নয়নের গতি কতটা হবে, কীভাবে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে কতটা অন্তর্ভুক্ত করা হবে- এসব প্রশ্ন এখন প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৪/৯/২০২৬