গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

কর্মজীবী নারীদের পারিবারিক আবেগঘন শ্রম সমাজে পুরোপুরি অস্বীকৃত

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০২ পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৫২ এএম ২০২৬
কর্মজীবী নারীদের পারিবারিক আবেগঘন শ্রম সমাজে পুরোপুরি অস্বীকৃত
ছবি

ছবি সংগৃহীত

কর্মজীবী নারীরা শুধু অফিসের কাজ করেন না, ঘরের সব দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে গৃহস্থালির কর্মভার তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সমাজে এখনো ঘরের কাজকে নিতান্তই নারীর বলেই ধরা হয়। বাইরের কর্মজগৎ সামলানোর পাশাপাশি নারী ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন ও পরিবারের সবার যত্ন নিতে গিয়ে ব্যক্তিগত ক্লান্তিতেও যে শ্রম  দেন; তা প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। এই বাস্তবতা উঠে এসেছে রাজধানীতে পরিচালিত এক গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, নারীর ক্ষমতায়ন দায়িত্ব বাড়িয়েছে। কিন্তু দ্বন্দ্বও তীব্র করেছে। তাদের আবেগঘন শ্রম সমাজে পুরোপুরি অস্বীকৃত বা ভুলভাবে চিহ্নিত হয়। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার

বাইরে থেকে যখন দেখি একজন শিক্ষিত কর্মজীবী নারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শহরের পথে চলছেন, অফিসে যাচ্ছেন, কর্মজীবন সামলাচ্ছেন আবার পরিবারকেও দেখছেন; তখন খুব সহজেই মনে হয়- ‘আহা, দেশটা কত সুন্দর বদলেছে, আজকের নারীরা কতা ক্ষমতাশালী, স্বাধীন! তারা শিক্ষিত, উপার্জন করছে, স্বাধীনতা ভোগ করছে।’ কিন্তু এই দৃশ্যমান ক্ষমতায়নের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য সংগ্রাম।

কর্মজীবী নারীর জীবন যেন এক অবিরাম দ্বৈত ভূমিকার গল্প-অফিসের ডেডলাইন সামলানো আর গৃহে রান্না, ঘর পরিষ্কার, সন্তানকে পড়ানো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। এ দ্বৈত ভূমিকা পালনের পথে তাদের দিতে হয় বিপুল আবেগঘন শ্রম। অথচ এ শ্রমকে কখনো ‘কাজ’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। বরং এটিকে দেখা হয় কর্তব্য হিসাবে, মাতৃত্বের স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসাবে, কিংবা স্বার্থপরতা হিসাবে- যখন তারা কাজ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলাফল- অবিরাম ক্লান্তি, অদৃশ্য ত্যাগ, আর ভুল স্বীকৃতি। বাইরে থেকে যে স্বাধীনতা আমরা উপভোগ করি, তা আসলে আংশিক, শর্তসাপেক্ষ, আর পিতৃতান্ত্রিক বিচার দ্বারা আক্রান্ত।

গবেষণায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন ৩২ নারী। তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত তিনজনের সাক্ষাৎকারের তথ্য পর্যালোচনায়- যা পাওয়া গেছে, এর খণ্ডাংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

এক. রাফু (ছদ্মনাম) একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা। তার ইউনিফর্ম, উচ্চতা, কর্তৃত্ব গর্বের প্রতীক হওয়ার কথা। অথচ তাকে লেবেল করা হয় ‘বেটা মানুষ’ হিসেবে। সমাজ তাকে ‘বেটা মানুষ’ আখ্যা দিয়ে লেবেল করে- যা আসলে নারীর পরিচয়কে খাটো করার এক প্রতীকী চেষ্টা! রাফুর অফিস শেষ হয় বিকাল ৫টায়। কিন্তু মানসিক উপস্থিতি চাই ২৪ ঘণ্টা। একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা হিসাবে রাফুর অফিস বিকাল ৫টায় ছুটি হলেও তাকে মানসিকভাবে অফিসের দায়িত্ব পালন করতে হয় চব্বিশ ঘণ্টা! শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে তিনি রান্না বা সন্তানকে পড়ানোর মতো কাজ করতে পারেন না, যেমনটা পরিবারের অ-কর্মজীবী নারীরা করেন। তবু তুলনা থামে না। স্বামী যখন গৃহকর্মীর রান্না খেতে অস্বীকার করেন, তখন ক্লান্তি সত্ত্বেও তাকে রান্না করতে হয়। এমনকি মেয়ের পড়াশোনায় খারাপ ফলাফলের দায়ও তার ঘাড়ে চাপানো হয়। পরিবারের ফিসফিসানি তাকে তাড়া করে : ‘কেমন স্ত্রী সে, স্বামী না খেয়ে ঘুমাবে?’ এ কথাগুলো ভূতের মতো তাকে রান্নাঘরে ঠেলে দেয়, বাধ্য করে ‘স্ত্রীর ইমেজ’ বাঁচাতে। না হলে আবারও লেবেল-না নারী, না স্ত্রী, না মা।

দুই. নিশি (ছদ্মনাম) একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের কর্মী। প্রতিদিন ভোরে স্বামীর ঘুম ভাঙার তিন ঘণ্টা আগে তার দিন শুরু হয়। রান্না, নাশতা প্রস্তুত, খাবার প্যাক করা, আড়াই বছরের মেয়েকে ডে-কেয়ারে পাঠানোর প্রস্তুতি-সব একসঙ্গে সামলাতে হয়। এক কাঁধে মেয়েকে, অন্য কাঁধে অফিস ব্যাগ নিয়ে তিনি ছুটে চলেন ভিড়ভাট্টার রাস্তায়। ডে-কেয়ারে পৌঁছালে মেয়ে আঁকড়ে ধরে কাঁদে। নিশি তাকে শান্ত করেন চকলেটের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, নিজের কান্না চেপে রেখে। ততক্ষণে অফিসে দেরি হয়ে গেছে। বাস ধরতে দৌড়াতে দৌড়াতে চুল আঁচড়ান। অফিসে পৌঁছানোর আগেই তার আবেগঘন শ্রম নিঃশেষ হয়ে যায়-যার মূল্য মেটানো হয় নিঃশব্দ কান্নায়। এতসব সংগ্রামের পরও শিক্ষিত কর্মজীবী নারীরা উদ্ভাবনী হন। তারা কৌশল তৈরি করেন-গৃহকর্ম, আউটসোর্স করা, খাবার ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা, সন্তানকে ছোট কাজে যুক্ত করা, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। এগুলো অবহেলার নয়, বরং দক্ষ ব্যবস্থাপনার নিদর্শন। অথচ সমাজ এগুলোকে স্বীকৃতি দেয় না। শ্বশুরবাড়ির ফিসফিসানি শোনা যায় রান্নাঘরে : ‘ছেলেটা কি সারাজীবন ফুডপান্ডার খাবার খাবে? স্ত্রীর হাতের রান্নার স্বাদ কি কোনোদিন পাবে না?’ ‘মা যদি নিজে না দেখাশোনা করে, বাচ্চারা পড়াশোনায় ভালো করবে কীভাবে? টিউটর যতই পড়াক।’ ফলে নারীর উদ্ভাবন, তার দূরদর্শিতা, আবেগী শ্রম-সবই থেকে যায় অস্বীকৃত। দ্বিমুখী শিক্ষা নারীর বুদ্ধিমত্তা ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়িয়েছে। তারা যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে, অন্যকে প্রশ্ন করতে পারে, নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা দ্বন্দ্বও বাড়িয়েছে।

তিন. মুনা (ছদ্মনাম) একজন পেশাজীবী- যিনি সবকিছু দূরদর্শিতা দিয়ে সামলান। কিন্তু যখন তিনি পরিবারের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুক্তি দেন, তখন তার শিক্ষাকেই অপমান করা হয়। তার প্রজ্ঞাকে বলা হয় অহংকার, তার উদ্বেগকে বলা হয় অবাধ্যতা, তার কণ্ঠকে বলা হয় অনৈতিকতা। একজন ‘উচ্চশিক্ষিত নারীকে’ বলা হয় উদ্ধত, তার কণ্ঠকে বলা হয় ‘নারীবাদী’, তার অর্জনকে বলা হয় ‘অনৈতিক’।

নারীর উদ্ভাবন, আবেগী শ্রম, অদৃশ্য কাজ সংসার টিকিয়ে রাখে। অথচ স্বীকৃতি পায় না। তাদের সহনশীলতাকে বলা হয় কর্তব্য, তাদের স্বাধীনতাকে বলা হয় অহংকার, তাদের ত্যাগকে বলা হয় মাতৃত্বের দায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন কাহিনি এ অদৃশ্য হাতগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে না। রাফু, নিশি আর মুনার মতো নারীরা সংসারকে বহন করবেন আজীবন স্বীকৃতি ছাড়া; উদ্ভাবক হয়েও সম্মান ছাড়া, মা হয়েও বিশ্রাম ছাড়া।

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

হঠাৎ হারিয়ে যায় পরিচয়হীন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানবসন্তান পথশিশুরা
১৪ অক্টোবর ২০২৬

হঠাৎ হারিয়ে যায় পরিচয়হীন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানবসন্তান পথশিশুরা

প্রায় প্রতিদিনই দশ-এগারো বছরের শেফালি বিজয় সরণি মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করত। তারা দুই ভাইবোন এখানেই...

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে কন্যাশিশুর সুরক্ষায় সব পরিবারই উদ্বিগ্ন
১৪ অক্টোবর ২০২৬

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে কন্যাশিশুর সুরক্ষায় সব পরিবারই উদ্বিগ্ন

কন্যাশিশুদের ঘিরে বাংলাদেশে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা, অপরিচিত মানুষের সঙ...

ঢাকার রাস্তায় রাইডশেয়ারিং সেবায় চালক-যাত্রী নারী
১৪ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার রাস্তায় রাইডশেয়ারিং সেবায় চালক-যাত্রী নারী

ঢাকার ব্যস্ত সড়ক। চারদিকে গাড়ির ভিড়, যানজট আর হর্নের শব্দ। এর মধ্যেই ফাঁক গলে এগিয়ে যাচ্ছে একটি মোটর...

মায়েদের সঙ্গে কারাগারে বন্দি ৩০৩ শিশু
১৪ অক্টোবর ২০২৬

মায়েদের সঙ্গে কারাগারে বন্দি ৩০৩ শিশু

দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ৩০৩টি শিশু রয়েছে বলে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিয়েছে সমাজসেবা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 19 ঘন্টা আগে