গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

মেনু

শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের ভবিষ্যৎ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০৬ পিএম, ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২১:১৫ এএম ২০২৬
শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের ভবিষ্যৎ
ছবি

ছবি সংগৃহীত

প্রত্যেক শিশুর জন্মের সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্নেরও জন্ম হয়। ওই স্বপ্নে থাকে শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা, ভেজালমুক্ত খাবার, নিরাপদ সড়ক ও বাসস্থান, নিশ্চিন্ত ঘুম, সময়মতো সুচিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের পৃথিবী গড়ার প্রস্তুতি হিসেবে সুশিক্ষা। এই স্বপ্নের সঙ্গে শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি দেশের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে থাকে।

আজকের শিশুই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, কৃষিবিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তাই শিশুর নিরাপত্তা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত উদ্বেগ নয়; একটি জাতির উন্নয়ন এবং সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর অস্তিত্ব ও অগ্রযাত্রার ভিত্তি। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় এমন অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনা ঘটে- যেখানে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। কখনো সড়ক দুর্ঘটনা, কখনো পানিতে ডুবে মৃত্যু, কখনো হাম বা অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব, কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা জনসমাগমস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও সুপরিকল্পিতভাবে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে।

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো প্রতিটি দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সেই শিক্ষাকে নীতিমালা, অবকাঠামো ও দৈনন্দিন চর্চায় রূপ দেওয়া। শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেই হবে না; সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তারও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। বিবেচনায় রাখতে হবে, শিশুর নিরাপত্তা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিবহন, নগর পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান সবাইকে নিয়ে এটি একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।

একটা শিশুর দিন শুরু হয় ঘর থেকে। এরপর সে যায় বিদ্যালয়ে, খেলার মাঠে, রাস্তায়, হাসপাতালে কিংবা বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে। অর্থাৎ তার নিরাপত্তা একাধিক পরিবেশের সঙ্গে জড়িত। একটি নিরাপদ পরিবার, নিরাপদ বিদ্যালয়, নিরাপদ সড়ক এবং নিরাপদ সমাজ সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে একটি নিরাপদ শৈশব। বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাকে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমনপথ, নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া, শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা এসব শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার।

স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদান কর্মসূচি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিটি দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত শিশুদের ওপরই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। এর পাশাপাশি শিশুদের বিভিন্ন ধরনের জীবনদক্ষতা শেখানো এবং বাস্তব জীবনে তার চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই শিক্ষা পরিবারে যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিদ্যালয়েও প্রয়োজন। শশুরা বয়স ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণে সব ধরনের ঝুঁকি সঠিকভাবে শনাক্ত বা মোকাবিলা করতে পারে না। তাই তাদের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব বড়দের হলেও, শিশুদেরও বয়সোপযোগী আত্মরক্ষা, সচেতনতা ও জীবনদক্ষতার শিক্ষা দিতে হবে।

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ খেলার জায়গা, অভিভাবকের তত্ত্বাবধান, কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ এবং সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম অনেক জীবন বাঁচাতে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে শিশুদের সাঁতার শেখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই বিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে নিরাপদ সাঁতার শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। কইভাবে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়কেন্দ্রিক নিরাপদ জোন, নির্ধারিত পারাপারব্যবস্থা, গতিনিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত, ট্রাফিক সচেতনতা এবং চালকদের দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। একটি শিশু নিরাপদে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে কি না, সেটিও রাষ্ট্রের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত।

শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। খেলার মাঠ কেবল বিনোদনের স্থান নয়; এটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের ক্ষেত্র। নিরাপদ খেলার জায়গা না থাকলে শিশুরা রাস্তা, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে চলে যেতে পারে। তাই শিশুর খেলার অধিকার নিশ্চিত করাও শিশু নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শশুদের আমরা বড়রাই কখনো কখনো নির্বিচারে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করি। বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের বেঁধে মারধর, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, শারীরিক নিপীড়ন কিংবা অবহেলার দৃশ্য সামনে আসে। কোথাও নিষ্ঠুর আচরণে, কোথাও ভুল চিকিৎসায়, কোথাও অনিরাপদ কর্মপরিবেশে শিশুর প্রাণহানি ঘটে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো শিশুদের প্রতি আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় শিশুদের কণ্ঠ শোনা প্রয়োজন। বিদ্যালয়, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে তারা কোথায় অনিরাপদ বোধ করে, কোন আচরণ তাদের ভয় পাইয়ে দেয়, কোথায় সাহায্য চাইতে দ্বিধা করে এসব জানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুদের মতামত গ্রহণ এবং নিরাপদ অভিযোগ জানানোর সুযোগ সৃষ্টি করলে অনেক ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। শিশুরা ভবিষ্যৎ- এ কথাটা আমরা প্রায়ই বলি। এটি কেবল আবেগপূর্ণ বাক্য নয়; বরং গভীর বাস্তবতা। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখার জন্য আমরা প্রতিদিন কী করছি, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জন্ম থেকে কৈশোর পর্যন্ত শিশুর শারীরিক, মানসিক, স্বাস্থ্যগত, সামাজিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় শিশু নিরাপত্তা কাঠামো’ প্রয়োজন। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, নিরাপত্তার মানদণ্ড, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে বিদ্যালয় নিরাপত্তা, শিশুস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, সাঁতার শিক্ষা, খেলার জায়গা, জরুরি চিকিৎসা, জীবনদক্ষতা এবং শিশু সুরক্ষা প্রশিক্ষণের জন্য দৃশ্যমান ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে। বাজেটে শিশু নিরাপত্তা গুরুত্ব পেলে সেটি শুধু ব্যয় হবে না; বরং দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগে পরিণত হবে।

কেএমএএ/আপ্র/২৯.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

বাধার প্রাচীর ভেঙে বিউটি পালের সংস্কৃতি চেতনায় আঘাতের প্রতিবাদ
২৯ জুলাই ২০২৬

বাধার প্রাচীর ভেঙে বিউটি পালের সংস্কৃতি চেতনায় আঘাতের প্রতিবাদ

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হওয়া, শিল্পীদের অনুষ্ঠান নিয়...

পরিশ্রমী, বিশ্বাসী হয়েও আদিবাসী নারীরা ন্যায্য মজুরিবঞ্চিত
২৯ জুলাই ২০২৬

পরিশ্রমী, বিশ্বাসী হয়েও আদিবাসী নারীরা ন্যায্য মজুরিবঞ্চিত

শ্রমবাজারে নারীর প্রসঙ্গ এলেই আমাদের চোখের সামনে প্রথমে ভেসে ওঠে সকালবেলা রাস্তায় সারি বেঁধে হেঁটে য...

পত্রিকা বিক্রি করেই চলে নার্গিসের জীবন
২৯ জুলাই ২০২৬

পত্রিকা বিক্রি করেই চলে নার্গিসের জীবন

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পায়ে হেঁটে সংবাদপত্র বিক্রি করছেন পঞ্চাশ-ঊর্ধ্ব নার্গিস খাতুন।...

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বপ্নের বাগানের নাম ‘গুলবাগিচা’
২৯ জুলাই ২০২৬

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বপ্নের বাগানের নাম ‘গুলবাগিচা’

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে নিত্য বসবাস এ গ্...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শিল্পী বললেন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ এখন প্রতিবাদের ভাষা

‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে গানটি সিলেটের এক শিক্ষিকাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া সমালোচনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শিক্ষকদের সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। গানটির গায়ক মেজবাহ রহমান বলেন, “আমাদের এই গানটি যে অন্যায্য সমালোচনার বিরুদ্ধে একটি বড় সামাজিক আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠবে, তা কখনো ভাবিনি। গানটি মূলত প্রকৃতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে এটি ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এখন এটি অনেকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন গানটি সত্যিই প্রতিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 20 ঘন্টা আগে