সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হওয়া, শিল্পীদের অনুষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক, নারী শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের প্রকাশ্য উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি, লালন অনুসারীদের ওপর হামলা কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাতের ঘটনা সমাজের একটি বড় অংশকে ভাবিয়ে তুলেছে। অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ করেছেন। যে দেশের মানুষকে মৌলিক চাহিদা পূরণের পিছে ছুটতেই দিনাতিপাত করতে হয়, তাদের জন্য সংস্কৃতির সংকটকে সহজে চিহ্নিত করা খুব সহজ নয়। তবে বিউটি পালের ঘটনাটি যেন সবার চেতনায় ওই আঘাত দিয়ে জানিয়ে দিল, এবার প্রতিবাদ করতে হবে; না হলে ঘুড়ির নাটাইয়ের সব সুতা অন্যের হাতে গোটানো হবে। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
সংকটকালে সংহতির শক্তিই ভাঙতে পারে বাধার কঠিন প্রাচীর। সেই সংহতি কোথা থেকে, কোন উপলক্ষ কেন্দ্র করে জন্ম নেবে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের ক্ষেত্রে যেন তা-ই হলো। তার একটি রিল ভিডিও ঘিরে গুটি কয়েক মানুষ যে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দিতে চেয়েছিল, সামাজিক পরিসরে বিউটি রানীর প্রতি লাখো মানুষের অনন্য সংহতি তা যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল। স্থানীয় শিক্ষা দপ্তর প্রধান শিক্ষিকার বিষয়ে যে তদন্তের কথা বলেছিল, তা থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে...’ গানের সঙ্গে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটার যে ভিডিও তিনি প্রকাশ করেছেন, তাতে সামাজিক সহিংসতার উপাদান আর খুঁজবেন না তারা।
সাইবার বুলিংসহ নানা অপপ্রচারের কারণে আইনের আশ্রয় নিতে হয়েছে বিউটি রানী পালকে। সাধারণ ডায়েরি করেছেন তিনি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গানের সঙ্গে ভিডিও ধারণ তার ব্যক্তিস্বাধীনতা হলেও ঘটনার পর ভিডিওটি সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু একই গানের সঙ্গে নানা রকম ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তার প্রতি সংহতি জানিয়ে যাচ্ছেন হাজারো মানুষ। এদের বড় অংশ শিক্ষক। সামাজিক মাধ্যমে এসব ভিডিওর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্মৃতি আর মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মতামত। এ ঘটনা দেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ইতিহাসে এ কারণে তাৎপর্যপূর্ণ যে, এটি শুধু প্রযুক্তির সহায়তায় একজন শিক্ষিকার পক্ষে মতপ্রকাশ নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক অনুভবের বহিঃপ্রকাশ। সেই অনুভবের নাম সংহতি।
এ ঘটনা এটিও মনে করিয়ে দিল- সংস্কৃতির ওপর আঘাত শুধু একটি অনুষ্ঠান, একটি গান বা একটি বাদ্যযন্ত্রের ওপর আঘাত নয়; একটি জাতির স্মৃতি, পরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের ওপরও আঘাত। তাই বিউটি পালের প্রতি মানুষের সংহতিকে অনেকে সংস্কৃতির পক্ষে দাঁড়ানোর প্রতীকী ভাষা হিসেবেই দেখছেন। এই সংহতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রকাশভঙ্গি। আগে কোনো ব্যক্তির চরিত্র, কর্ম বা অবদানের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া হতো সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে। এখন সেই সাক্ষ্য ভিডিও হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক মাধ্যমে। ডিজিটাল মাধ্যম এক নতুন ধরনের জনসাক্ষ্যের জন্ম দিয়েছে।
বিউটি পালের পক্ষে প্রকাশিত অধিকাংশ ভিডিওর বিষয়বস্তু লক্ষ্য করলে আমরা দেখি, বক্তারা তার গানের সঙ্গে শাড়ির আঁচল উড়িয়ে কয়েক পা হাঁটার চেয়ে বেশি তার শিক্ষকতা, সততা, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানবিক আচরণ নিয়ে কথা বলছেন। কেউ কেউ এই শিক্ষকের নীল শাড়িটির উল্লেখ করে স্মরণ করিয়ে দিলেন, এই পোশাকটি বাংলাদেশের নারীদের, যার ব্যবহার দুই দশক ধরে ক্রমে কমছে।
বিউটি পালকে সমর্থন করা সংবেদনশীল মানুষরা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজেদের শৈশবের স্বাদও নিচ্ছেন। নিজের বিদ্যালয়, সেখানকার মাঠ, প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিচারণ করছেন। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড ডিফারেন্ট টাচের ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে, অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে...’ কতজনকে তার কৈশোরে পৌঁছে দিয়েছে কিছুক্ষণের জন্য! সেই কৈশোরে থাকা অনেক আপনজন হয়তো আর এখন তাদের জীবনে নেই। অনেক মানুষ হয়তো অধরাই রয়েছে। এত বিপুল অনুভব এনে দেওয়ার সক্ষমতা থাকে শুধু আচমকা ভেসে আসা পুরোনো সুরের। ফলে শিক্ষিকা বিউটি পালের ভিডিওটি তর্কবিতর্ক অতিক্রম করে ব্যক্তিগত ঘটনার সীমা পেরিয়ে মানুষের স্মৃতি, সম্পর্ক ও সামাজিক আস্থার আলোচনায় পরিণত হয়েছে। আর তাতেই মানুষ খুঁজে পেয়েছেন নিজের যুক্ততা। এখানেই এই সংহতির সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।
বাংলাদেশের সমাজে শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি মূল্যবোধের ধারক, সংস্কৃতির বাহক এবং সামাজিক নেতৃত্বের প্রতীক। তাই একজন শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো অনেকের কাছে একটি নৈতিক অবস্থানের প্রকাশও বটে। যদিও আমরা সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের হেনস্তার বহু মর্মান্তিক নজির দেখেছি। কত শিক্ষককে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে সারাদেশে! তবে সব ঘটনা এক সূত্রে বসানোর সুযোগ নেই।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিউটি পালের ঘটনাটি নারীর জনপরিসরে উপস্থিতি নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকের মতে, একজন নারী শিক্ষকের প্রতি এই ব্যাপক সমর্থন কর্মক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা ও দৃশ্যমান উপস্থিতির পক্ষেও একটি প্রতীকী অবস্থান। এই ঘটনার সময় আরেকটি দৃশ্যও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসে। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একজন ভাসমান মানুষের অস্থায়ী মসজিদ নির্মাণ প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে নাম না জানা এক কিশোর দুর্বিনীত এক ব্যক্তির প্রশ্নের বিপরীতে জবাব দিয়েছে– ‘আমি মানুষ’। বলে রাখি, দুর্বিনীত ব্যক্তিটি কিশোরকে তার ধর্ম-পরিচয় জানতে চেয়েছিল। কিশোরের সেই ‘ধর্মের আগে আমি মানুষ’ বক্তব্যটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কখনও একজন শিক্ষিকার পক্ষে সংহতি, কখনও এক কিশোরের মানবিক উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সামাজিক মাধ্যম কেবল বিভাজনের নয়; মানবিক মূল্যবোধ বিস্তারেরও একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র হতে পারে।
বিউটি পালকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই ডিজিটাল সংহতি ইতোমধ্যে একটি সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে– মানুষ এখনও স্মৃতি, কৃতজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও মানবিক সম্পর্কের ভিত্তিতে একত্র হতে জানে। সংকটের সময় সমাজ এখনও তার শিক্ষককে মনে রাখে, তার শিল্পকে রক্ষা করতে চায়, তার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আঁকড়ে ধরে স্বস্তি পায়।
কেএমএএ/আপ্র/২৯.০৭.২০২৬