খলিলুর রহমান খলিল, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি: ‘হামরা গরিব মানুষ। সরকার ১৫ টাকা কেজি দরে চাউল দেয়, যাতে হামরা খাবার পারি। এবার যে চাউল দিছে, তাও সাত মিশালি। সকালে ভাত রান্না করলে বিকালে আর থাকে না। পুষ্টি চাউলের কথা কয়া অপুষ্টি চাল হামাক ডিলারেরা দিছে।’
আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আনছার আলী। তার অভিযোগ, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় এবার যে চাল দেওয়া হয়েছে, তার মান আগের তুলনায় খারাপ। শুধু আনছার আলী নন, তার মতো একাধিক সুবিধাভোগীও চালের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের চকতাহিরা গ্রামের বাসিন্দা মজনু মিয়া বলেন, ‘আগের দিনের চালগুলো ভালোই ছিল। হাইব্রিড হলেও ভাত খাওয়া যেত। তবে এবার যে চাল দিছে, তার মান খুবই খারাপ। লাল চাউলের ভাতে বাজে গন্ধ আসে, ভাত খাওয়া যায় না। রান্নার কিছুক্ষণ পরেই নষ্ট হয়ে যায়। হামরা গরিব মানুষ। শুনছি, সরকার ভর্তুকি দিয়ে কম দামে ভালো চাউল দেয়। এবার ফির উল্টা লাল পুরাতন চাউল দিছে ডিলারেরা।’
সরেজমিনে দেখা যায়, গত সোমবার দুপুরে উপজেলার অন্তত সাতটি ডিলারের বিতরণকেন্দ্রে নিম্নমানের চাল বিতরণ ও ছেঁড়া-ফাটা বস্তা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, চালের মান নিয়ে অনিয়মের পাশাপাশি বিতরণ কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তদারকির ঘাটতিও রয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিম্নমানের চাল সরবরাহ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় তারাগঞ্জের পাঁচটি ইউনিয়নে ২১ জন ডিলারের মাধ্যমে ১০ হাজার ২২৬ জন সুবিধাভোগীকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। প্রতি কেজি চালের দাম ১৫ টাকা। চাল বিতরণের নির্ধারিত সময়সূচি, ব্যানার টাঙানো, সঠিক ওজন নিশ্চিত করা, চালের গুণগত মান পরীক্ষা এবং বিতরণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ট্যাগ কর্মকর্তারা।
তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যে নিয়মিত তদারকির ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু সায়েম হাসান বলেন, ‘এক বছর আগে একবার খাদ্য অফিস থেকে চিঠি পেয়েছি। এরপর আর তেমন খোঁজখবর নেই। মাঝেমধ্যে চালের ডিলাররা বিতরণের জন্য জানায়।’
তারাগঞ্জ বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীন আপান বলেন, ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নিম্নমানের চাল বিতরণে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে। সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষ এ সুবিধার আওতায়। সেখানে এই অনিয়মের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কারণে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার বিগত দিনে এক কেজি চাল ৪৯ টাকায় কিনেছে। সেখানে তামড়ি, খুদ ও অপুষ্ট চাল থাকবে কেন? খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাদের অনিয়মের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে চাল সরবরাহ করা হয়েছে বলে মনে করছি। এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে সঠিক তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করছি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।’
অভিযোগের বিষয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার আব্দুস সামাদ মুঠোফোনে বলেন, সরকারি গুদাম থেকে যেভাবে চাল সরবরাহ করা হয়, তারা সেভাবেই কার্ডধারীদের মধ্যে বিতরণ করেন। চালের গুণগত মান নির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।
নিম্নমানের চাল বিতরণ ও ছেঁড়া-ফাটা বস্তা ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে হলে জেলা কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হবে। এ ছাড়া আমার কোনো বক্তব্য দিতে নিষেধ আছে।’
অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এ বিষয় নিয়ে তর্ক করতে চাই না। আমার অফিসের সব তথ্য উপজেলা অফিস থেকে নিতে পারবেন। আমি এখানে কী করি, উনি (উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা) সব জানেন।’
চাল বিতরণে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এবং চালের মান নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা আফরোজা বেগমও কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে এলে বক্তব্য দিতে পারবেন।
তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ছালেহ আজিজ। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘আমাদের সংগ্রহের বাইরে থেকেও কিছু চাল আসে। নিম্নমানের চাল, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বিতরণ ও আর্থিক লেনদেনসহ সব অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সানা/আপ্র/২৮/১০/২০২৬