সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশকে ‘চোর’ আখ্যা দেওয়ার মতো কঠোর বক্তব্য যখন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মুখ থেকে আসে, তখন বিষয়টি শুধু একটি বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সততা, জনগণের প্রতি জবাবদিহি এবং সুশাসনের মৌলিক প্রশ্ন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পিকার সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। তার পরদিনই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু লক্ষ্মীপুরে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে বলেন, রাজনীতিবিদদের কাজ বক্তৃতা দেওয়া আর সরকারি চাকরিজীবীদের কাজ কিছু চুরি করা, কিছু কাজ করা। একই বক্তব্যে তিনি স্বীকার করেছেন, দুর্নীতি সমাজে রয়েছে এবং তা প্রতিরোধ করা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রধান দায়িত্ব।
ভাষার দিক থেকে এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে কঠোর এবং এর ফলে সৎ ও নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সামগ্রিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ একটি বিশাল সরকারি কর্মীবাহিনীর প্রত্যেক সদস্য দুর্নীতিবাজ-এমন সিদ্ধান্ত তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু একই সঙ্গে দুর্নীতির ভয়াবহ বাস্তবতাকেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় খানা জরিপ বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে প্রাক্কলিত ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের তুলনায় এ পরিমাণ বেড়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার খানার হারও বেড়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি নাগরিকের দৈনন্দিন সেবা পাওয়ার পথে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকেত।
এখন তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন-এত বিপুল ঘুষের অর্থ যাচ্ছে কোথায়, কার হাতে যাচ্ছে এবং কারা এর সুবিধাভোগী? শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়ী করলেই উত্তর মিলবে না। সরকারি প্রকল্প, ঠিকাদারি, ভূমি, কর, নিয়োগ, সেবা প্রদান ও অনুমোদনের প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কোথায় যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের বক্তব্যকে এখন দৃশ্যমান কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি সরকারি সেবার নির্ধারিত সময়, ব্যয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য প্রকাশ্য করতে হবে। যেখানে সম্ভব, সরাসরি মানুষের সঙ্গে কর্মকর্তার যোগাযোগ কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়াতে হবে। অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, অবৈধ সম্পদের হিসাব যাচাই, ঘুষের অর্থের উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান এবং প্রমাণিত অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা, মধ্যস্থতাকারী এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক-সবার দায় নির্ধারণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুর্নীতির দায় কোনো একটি শ্রেণির ওপর চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র দায়মুক্ত হতে পারে না। রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কোনো সুবিধাভোগী-আইনের চোখে সবাই সমান। ‘চোর’ শব্দ উচ্চারণ করে ক্ষোভ প্রকাশ সহজ; কিন্তু দুর্নীতির পথ বন্ধ করা কঠিন। রাষ্ট্রকে সেই কঠিন কাজটিই করতে হবে।
অতএব অপবাদ নয়, প্রমাণ; প্রতিশ্রুতি নয়, জবাবদিহি; অভিযান নয়, স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার-এই হোক দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।
সানা/আপ্র/১৭/৯/২০২৬