রাজধানীর ফুসফুসখ্যাত ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী লেক এবং জলাধারগুলো আজ দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা, দখল ও দূষণে মুমূর্ষু। হাতিরঝিল, গুলশান-বারিধারা, ধানমন্ডি কিংবা রবীন্দ্রস্রোতস্বিনী বা কল্যাণপুর জলাধার- সব জায়গাতেই ময়লা-আবর্জনা ফেলা, অবৈধ পলিথিন ও গৃহস্থালির বর্জ্য সরাসরি সংযোগ এবং অননুমোদিত স্থাপনার দৌরাত্ম্য পানিকে করেছে বিষাক্ত ও দুর্গন্ধময়। এই যখন সামগ্রিক চিত্র, ঠিক তখনই রাজধানীর লেকগুলো দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার যে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা সময়োপযোগী ও অত্যন্ত যুগান্তকারী। একটি মেগাসিটির পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে জলাধার বাঁচানোর বিকল্প নেই। এতদিন নানা সংস্থা তথা রাজউক, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে দায়িত্বের সমন্বয়হীনতা এবং ঠেলাঠেলির সংস্কৃতির কারণে লেক রক্ষার ভালো উদ্যোগগুলো মাঝপথে হোঁচট খেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ তাগিদ প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার চূড়ান্ত স্ফুরণ ঘটেছে- যা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত দৃশ্যমান ফল আনতে বাধ্য করবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, লেকগুলোর দূষণমুক্তে সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগটিকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো উচিত। তা হলো সব লেকের পাড়ে অবৈধ দখল পাকাপাকিভাবে উচ্ছেদ করে সীমানা নির্ধারণ ও ওয়াকওয়েগুলোর পরিবেশবান্ধব রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্যুয়ারেজের পানি সরাসরি লেকে পড়া বন্ধ করতে প্রতিটি পয়েন্টে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলা রোধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও সিসিটিভি ক্যামেরা মনিটরিং চালু করা জরুরি। একটি সেন্ট্রাল টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে- যেখানে স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা থাকবেন এবং মাসিক ভিত্তিতে কাজের মূল্যায়ন করবেন। শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়, জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে দেশীয় মাছ ও জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগও নিতে হবে। সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতার পাশাপাশি নাগরিক কমিটিগুলোকে তদারকির কাজে সম্পৃক্ত করা গেলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
বলা বাহুল্য, সরকারের অনেক নির্দেশনা শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে; বাস্তবায়ন দেখা যান না। তাই প্রয়োজন অবিরাম ও কঠোর তদারকি। রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য ও বিশ্বমানের গ্রিন সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জলাধারগুলোকে দখলমুক্ত করে এগুলোর স্বাভাবিক প্রবহমানতা ফিরিয়ে আনা এখন অস্তিত্বের লড়াই। কোনো প্রভাবশালী মহল বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার না করে যদি এই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা যায়, তাহলে অচিরেই রাজধানীর লেকগুলো তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে; নগরবাসী পাবে এক নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল পরিবেশ। সরকারের এই সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার দেয়াল ভেঙে দ্রুত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খননকাজ শুরু করার এখনই সময়। আমাদের প্রত্যাশা, রাজধানীর লেকগুলো দূষণ রোধের নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন করবেন সংশ্লিষ্টরা।
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬