ডা. শারমিন ইসলাম: সকাল থেকে কাজের চাপ। একের পর এক সভা, জরুরি ফোন, কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা- সব মিলিয়ে কর্মব্যস্ত দিনে নিজের খাবারের কথা মনে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো সকালের নাশতা বাদ যায়, কখনো দুপুরের খাবার খেতে দেরি হয়। আবার কাজের ফাঁকে ক্ষুধা লাগলে চা-বিস্কুট, কেক, মিষ্টি কিংবা ভাজাপোড়াই হয়ে ওঠে সহজ সমাধান।
এভাবে দিনের পর দিন চললে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তবে অফিসে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার জন্য কঠিন কোনো খাদ্যতালিকা অনুসরণ কিংবা পছন্দের খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং খাবারের ধরন ও পরিমাণে কিছু সচেতন পরিবর্তন আনাই হতে পারে সুস্থ থাকার সহজ উপায়।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মূল ভিত্তি হলো পর্যাপ্ততা, ভারসাম্য, পরিমিতি ও বৈচিত্র্য। অর্থাৎ শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমাতে হবে।
প্লেটের বড় অংশজুড়ে সবজি: অফিসের দুপুরের খাবারে প্লেটের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রাখা যেতে পারে শাকসবজি। বিভিন্ন ধরনের শাক, শিম, ফুলকপি, কুমড়া, লাউ, টমেটো, শসা ও অন্যান্য মৌসুমি সবজি হতে পারে ভালো বিকল্প। এতে খাবারে বৈচিত্র্য যেমন বাড়ে, তেমনি শরীরও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পায়।
খাবারের সঙ্গে ফল রাখার অভ্যাসও ভালো। তবে সম্ভব হলে ফলের রসের পরিবর্তে আস্ত ফল খাওয়া উচিত। আস্ত ফলে আঁশ থাকে এবং তা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।
শর্করা হোক পরিমিত: ভাত, রুটি, ওটসসহ শর্করাজাতীয় খাবার শরীরের শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে খাবারে পূর্ণশস্য বা কম প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো। আটার রুটি, ওটস ও লাল চালের পাশাপাশি ডাল, ছোলা ও শিমজাতীয় খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এগুলো আঁশ ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস।
সাদা ভাত বা সাদা পাউরুটিও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে এসব খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি ও প্রোটিন রাখা এবং পরিশোধিত বা প্রক্রিয়াজাত শর্করাজাতীয় খাবার অতিরিক্ত না খাওয়ার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিন: মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, শিম, ছোলা, বাদাম ও বীজ হতে পারে প্রোটিনের ভালো উৎস। সহজভাবে বলতে গেলে, ভাতের সঙ্গে ডাল, মাছ ও প্রচুর শাকসবজি কিংবা রুটির সঙ্গে শাকসবজি, ডিম বা মুরগি ও সালাদ রাখা যেতে পারে।
চর্বির ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করা এবং অস্বাস্থ্যকর ও ট্রান্স ফ্যাট কমানো ভালো। নিয়মিত অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, বেকারি পণ্য ও প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলতে হবে। ভাজাপোড়া খাবার প্রতিদিনের নাশতার অংশ না করে মাঝেমধ্যে খাওয়াই ভালো।
চা-বিরতিতেও স্বাস্থ্যকর বিকল্প: অফিসে চা বা কফি অনেকের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। সমস্যা চা-কফি নয়; বরং এর সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবার চা-বিরতিতে বিস্কুট, কেক, মিষ্টি কিংবা ভাজাপোড়া খাবারের পরিবর্তে আস্ত ফল, অল্প পরিমাণ লবণবিহীন বাদাম, ভাজা ছোলা বা চানা, টক দই কিংবা সেদ্ধ ডিম খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পানি পানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। চিনিযুক্ত পানীয় যতটা সম্ভব সীমিত রাখুন।
লবণের অদৃশ্য উৎস: অনেকে মনে করেন, খাবারে বাড়তি লবণ না দিলেই লবণ কম খাওয়া হচ্ছে। বাস্তবে প্রক্রিয়াজাত খাবার, বিভিন্ন ধরনের সস, তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত করা খাবার এবং লবণাক্ত নাশতাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ থাকতে পারে। তাই খাবারে বাড়তি লবণ দেওয়ার আগে স্বাদ দেখে নেওয়া এবং অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার কমিয়ে দেওয়া জরুরি।
খাওয়ার আগে নিজেকেই প্রশ্ন করুন: দুপুরের খাবারের আগে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন নিজেকে করা যেতে পারে- প্লেটে কি যথেষ্ট শাকসবজি আছে? ভালো মানের প্রোটিনের কোনো উৎস কি রেখেছি? শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণ কি পরিমিত? চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে কি পানি পান করছি? আমি কি সত্যিই ক্ষুধার কারণে খাচ্ছি, নাকি সামনে খাবার আছে বলেই খাচ্ছি?
এই আত্মসচেতনতা খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অর্থ কম খাওয়া নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক খাবার বেছে নেওয়া।
তাই কর্মদিবস যতই ব্যস্ত হোক, খাবারের দিকে একটু নজর দিন। প্লেটে বেশি করে শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য ও ডাল রাখুন। স্বাস্থ্যকর প্রোটিন বেছে নিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি পরিমিত গ্রহণ করুন এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত নাশতা কমিয়ে দিন। প্রতিদিনের ছোট ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যস্ত কর্মজীবনে তাই কাজের পাশাপাশি নিজের প্লেটেও স্বাস্থ্যের জন্য একটু জায়গা রাখা জরুরি।
লেখক: মেডিক্যাল অ্যাডভাইজার, স্কলাসটিকা
সানা/আপ্র/১৬/৯/২০২৬