যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে একক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সব চুক্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
নির্বাচনে অর্জিত নতুন তদন্ত ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প পরিবারের বিতর্কিত ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নজর দিতে চায় ডেমোক্র্যাট শিবির। ট্রাম্প আমলের দুর্নীতিকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রধান হাতিয়ার বানানোর লক্ষ্যে এই পরিকল্পনা করছে তারা।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়ে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ; উভয় কক্ষে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। ওই দিন কোটি কোটি মার্কিন ভোটার সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
নির্বাচনে জয়ের পরপরই রিপাবলিকান শিবিরকে সতর্ক বার্তা পাঠাতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করেনি তারা। মঙ্গলবার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে একপ্রকার হুঁশিয়ারি দেন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রবার্ট গার্সিয়া।
খুব শিগগিরই কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী হাউস ওভারসাইট কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন তিনি। এক্সে রবার্ট গার্সিয়া লিখেছেন, ‘‘নিজের জন্য ভালো দেখে আইনজীবী ঠিক করে রাখুন।’’
রবার্ট গার্সিয়ার পোস্টের এর ঠিক এক ঘণ্টার মাথায় একই সুরে এক্সে বার্তা দেন সিনেটর রন ওয়াইডেন; যিনি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট ফিন্যান্স কমিটির নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। এক্সে তিনি লেখেন, ‘‘বর্তমানে কেবল আইনি সমন পাঠানোর পালা।’’
‘‘আপনাদের অন্যান্য সব কাজ বাতিল করে সূচি প্রস্তুত রাখুন,’’ ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে একই মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ডেলিয়া রামিরেজ।
বুধবার থেকে ডেমোক্র্যাটিক কমিটির শীর্ষ নেতারা ব্যাপক প্রশাসনিক তদারকি পরিকল্পনার খসড়া সাজানো শুরু করেছেন। সেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং দেশটির বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
বিশেষ করে ওয়াইডেন ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে, ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও বিশ্বখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মধ্যকার গোপনে হওয়া সব চুক্তি নিয়ে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনা করতে চান।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই যেকোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং বুধবার এই সম্ভাব্য তদন্তের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‘ডেমোক্র্যাটরা যদি কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুয়া তদন্ত ও উগ্র বামপন্থী নীতি বাস্তবায়নের পেছনে সময় নষ্ট করে, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আপামর জনগণের স্বার্থেরই পরিপন্থী কাজ করাকে বেছে নিচ্ছে বলে আমরা ধরে নেব।’’
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে হোয়াইট হাউসের অপর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ডেমোক্র্যাটদের এই মারমুখী বার্তা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘তাদের হয়তো মনে করিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাষ্ট্রের সমস্ত নির্বাহী ক্ষমতা এখনও আমাদের হাতেই সুরক্ষিত রয়েছে।’’
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও রিপাবলিকানদের বৃহত্তম অর্থদাতা ইলন মাস্ক, ট্রাম্পের ছেলেরা এবং রিপাবলিকান পার্টির একঝাঁক শীর্ষ চাঁদা দাতা ও বড় বড় সরকারি ঠিকাদারকে আগামী দিনে বিস্তৃত তদন্তের মুখোমুখি করা হতে পারে।
যা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি অর্ধেক সময়জুড়ে রাজনীতির প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় এক ডজন অভিজ্ঞ আইনজীবী, কংগ্রেস সদস্য, আইনসভার সহকারী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে রয়টার্স বিশেষ এক প্রতিবেদনে এই ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্যের অনুরোধ জানানো হলেও ইলন মাস্কের কোনও প্রতিনিধি তাতে সাড়া দেননি।
প্রেসিডেন্টের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের প্রতিনিধি এ বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে আরেক ছেলে এরিক ট্রাম্পের প্রতিনিধিও পর্যালোচনার অনুরোধে কোনও জবাব দেননি।
রয়টার্স বলছে, ডেমোক্র্যাটরা এখনই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি কোনো অভিশংসন প্রস্তাব না এনে, বরং বিচারবিভাগীয় দীর্ঘ তদন্তের পথ বেছে নিতে বেশি আগ্রহী।
কংগ্রেসের তদারকি বিষয়ক অভিজ্ঞ আইনজীবী ও আর্নল্ড অ্যান্ড পোর্টার ল ফার্মের বিশেষজ্ঞ রেচেল কটন বলেন, আমরা সামনে খুব আক্রমণাত্মক ও সুদূরপ্রসারী একঝাঁক তদন্ত দেখতে যাচ্ছি; যা একই সঙ্গে প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বেসরকারি বাণিজ্যিক খাতম উভয়কেই প্রচণ্ড চাপের মুখে ফেলবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের সময়ে হওয়া নজিরবিহীন দুর্নীতি প্রকাশ্যে আনা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আসল সমস্যা, যেমন নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ও পেট্রোলের চড়া দাম মোকাবিলার মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
ডেমোক্র্যাটরা এই রাজনৈতিক পদক্ষেপে কতটা সাফল্য পাবে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার লড়াইয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভবিষ্যৎ সমীকরণ।
‘‘ডেমোক্র্যাটরা ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে আক্রমণ করার চেয়ে বেশি মনোযোগ দেবে এই দুর্নীতির দায় পুরো ট্রাম্প প্রশাসন এবং শেষ পর্যন্ত পুরো রিপাবলিকান পার্টির গায়ে লেপে দিতে,’’ বলেন সাবেক রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমালোচক সারা লংওয়েল।
তিনি বলেন, এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য হলো ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা যেন ভবিষ্যতে ২০২৮ সালের নির্বাচনে নতুন কোনো রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করতে না পারেন।
লংওয়েল বলেন, সদ্য প্রয়াত কুখ্যাত অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সম্পর্কিত সংবেদনশীল তথ্য ও নথিপত্র রিপাবলিকানরা কীভাবে পরিচালনা করেছিল, তা নিয়ে তদন্ত করলেও ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
যদিও এটি একটি রাজনৈতিক নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। তারপরও যখনই এপস্টেইনের প্রসঙ্গ সামনে আসে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা মারাত্মকভাবে হোঁচট খায়।
তবে ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা যদি সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তাহলে তা উল্টো তাদের দিকেই ঘুরে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন রিপাবলিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক রন বনজিন।
‘‘আমেরিকান ভোটারদের মূল দুশ্চিন্তা এখন জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে। ডেমোক্র্যাটদের প্রতিশোধ নেওয়ার এই তীব্র ঝোঁক যদি তাদের মূল আইন প্রণয়ন সম্পর্কিত কাজকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে ওয়াশিংটনে তাদের এই অর্জিত একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার মেয়াদ কিন্তু খুব বেশি দীর্ঘ হবে না।’’
গত বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পরিচালিত রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৪৮ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছিলেন, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ই নির্বাচনে তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাতারাতি বৃদ্ধি পাওয়া এবং তার পরিবারের একের পর এক ক্রিপ্টোকারেন্সি ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক ভোটার।
আগস্টে প্রকাশিত রয়টার্স-ইপসোসের অন্য এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বিশ্বাস করেন, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সরকারি সিদ্ধান্তগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে।
ডিসি/ আপ্র/০৫/১১/২০২৬