শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা—দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের এসব সংকট মোকাবিলায় বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে বছরে মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বাড়ার পাশাপাশি সব মিলিয়ে ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রকল্পটির আওতায় দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবেন বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
একসময় প্রাণবন্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ১৯৭০-এর দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশে পদ্মার প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব এ অঞ্চলে পড়েছে। এতে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়ালসহ বিভিন্ন নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নদীতে পলি জমা, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় এলাকার মানুষ সুপেয় পানির সংকটে পড়েন। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি আর্সেনিক দূষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বর্ষায় নদী ও খালে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধনের আশা
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। পানি ভবনে এ-সংক্রান্ত একটি পৃথক অফিসও স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করা হয়। ব্যারাজের কাজের অগ্রগতি আরও গতিশীল হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটির দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। কৃষি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছর পর ওই অঞ্চলে মানুষের বসবাস কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মাছসহ বিভিন্ন প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যারাজ নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। এর পুরো অর্থায়ন হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। তবে দ্বিতীয় ধাপে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়তে পারে। চলতি বছরের জুলাইয়ে কাজ শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্য
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর করাই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য। বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে প্রকল্পে।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় নির্মিত হবে প্রকল্পের মূল অবকাঠামো। এর আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট, ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ, দুটি মাছ চলাচলের পথ, নৌযান চলাচলের জন্য বিশেষ জলকপাট, গাইড বাঁধ ও সংযোগ বাঁধ।
ব্যারাজে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচের সুযোগ বাড়ানো হবে।
প্রাথমিকভাবে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
নদী পুনরুজ্জীবন ও লবণাক্ততা কমানোর আশা
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ প্রধান নদীব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো, সুন্দরবনে মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া যশোরের ভবদহসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ন এবং আর্সেনিক দূষণ কমানোও প্রকল্পের লক্ষ্য।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। গত দুই দশকে নদীভাঙনের কারণে পদ্মা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীতীরবর্তী জেলাগুলোতে প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবার সরাসরি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত খনন, তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ এবং নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সতর্কতার পরামর্শ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংকটের পাশাপাশি সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা আরও বাড়তে পারে। পলি জমার কারণে জলাবদ্ধতাও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় অঞ্চলগুলোতে মিঠাপানির সরবরাহ ও প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন, যেখানে পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটির মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হতে পারে এবং পানি ও মাটির লবণাক্ততা কমতে পারে। তবে নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন, উজানে নদী ক্ষয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, পদ্মা ব্যারাজ জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। এ ছাড়া নৌ চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, কৃষি, অর্থনীতি ও প্রাণিসম্পদও ক্ষতির মুখে পড়ছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরো বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০৪ সালের দিকে আবার উদ্যোগ নেন। তবে তখন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাঁরা বিষয়টি সামনে এনে ব্যারাজ নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির প্রবাহ বাড়বে, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন হবে, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে গতি আসবে এবং জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার সমস্যা মোকাবিলায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব সুফল কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করার ওপর।
এসি/আপ্র/০২/১১/২০২৬