সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের খবর সামনে আসছে। অধিকাংশ ঘটনাই ঘটছে বাসাবাড়ির রান্নাঘরে। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সিলিন্ডারের চেয়ে এর সঙ্গে ব্যবহৃত আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের ত্রুটিই এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। ফলে সাধারণ একটি রান্নাঘরই ধীরে ধীরে ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ বিস্ফোরণের মূল কারণ গ্যাস লিকেজ। হোস পাইপ, রেগুলেটর, ভালভ বা নজলের ত্রুটির কারণে গ্যাস বের হয়ে জমে থাকে। পরে সামান্য আগুন বা স্পার্কের সংস্পর্শে তা ভয়াবহ বিস্ফোরণে রূপ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে পাইপলাইনের গ্যাস লিকেজ থেকেও একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে।
দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসকরা জানান, এসব বিস্ফোরণ অনেক সময় এতটাই মারাত্মক হয় যে রোগীদের চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। হাত-পা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা শরীরের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা: কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন; পরে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু হয়। রাজধানীর মুগদায় রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে একজনের মৃত্যু হয়। ভাটারায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বাবা-ছেলে দগ্ধ হয়ে মারা যান।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দুর্ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বড় প্রবণতার অংশ।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান: ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে আগুনের ঘটনা ঘটেছে ২৭,০৫৯টি। মৃত্যু: ৮৫ জনের, আহত: ২৬৭ জন। এর মধ্যে- চুলা থেকে আগুন: ১০.৭৫, সিলিন্ডার যন্ত্রাংশ লিকেজ: ৩.৪০%, গ্যাসলাইন লিকেজ: ২.০৮% এবং সিলিন্ডার বিস্ফোরণ: ০.৪৫%। তবে বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করা হয়, কারণ অনেক মৃত্যু পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে ঘটে এবং তা হিসাবভুক্ত হয় না।
দুর্ঘটনার মূল কারণ: বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে কয়েকটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে-ব্যবহারকারীর অসচেতনতা, নিম্নমানের হোস পাইপ, রেগুলেটর ও ভালভ, অবৈধভাবে গ্যাস রিফিলিং, সঠিকভাবে রেগুলেটর সংযুক্ত না করা এবং রাতে চুলা বন্ধ না রেখে ঘুমানো।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, অনেক সময় ঘরের ভেতরে গ্যাস জমে থাকলেও মানুষ তা বুঝতে পারেন না। ফলে সকালে চুলা জ্বালানোর সময়ই ঘটে বিস্ফোরণ।
তদারকির ঘাটতি ও কাঠামোগত সমস্যা: দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। বাজারে রয়েছে কোটি কোটি সিলিন্ডার। কিন্তু- মান পরীক্ষার জন্য কার্যকর পরীক্ষণ কেন্দ্র নেই, সীমিত জনবল দিয়ে তদারকি চলছে, আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং অবৈধ রিফিলিং বন্ধে কার্যকর নজরদারি নেই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সিলিন্ডার নয়-এর সঙ্গে ব্যবহৃত প্রতিটি উপাদানের মান নিশ্চিত করা জরুরি।
কেন বিস্ফোরণ এত ভয়াবহ: চিকিৎসকদের মতে, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এখন সাধারণ আগুনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এটি প্রায় বোমার মতো আঘাত করে। শরীরের ২০% এর বেশি পুড়লে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়; বদ্ধ ঘরে আগুন লাগলে শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে।
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন: ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ-
* অবৈধ রিফিলিং সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে
* নিম্নমানের সিলিন্ডার ও যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা যাবে না
* নিয়মিত হাইড্রোলিক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে
* সিলিন্ডারের মান পরীক্ষার জন্য পরীক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে
* রেগুলেটর সঠিকভাবে সংযুক্ত করতে হবে
* গ্যাসের গন্ধ পেলে কখনো আগুন জ্বালানো যাবে না
* চুলা জ্বালানোর আগে দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে
* রাতে ঘুমানোর আগে চুলা ও রেগুলেটর বন্ধ করতে হবে
* অনুমোদিত ডিলার ছাড়া সিলিন্ডার কেনা যাবে না
* ব্যবহারবিধি ও নিরাপত্তা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে
পরিশেষ: গ্যাস সিলিন্ডার নিজে ততটা বিপজ্জনক নয়, যতটা বিপজ্জনক এর ভুল ব্যবহার ও নিম্নমানের সরঞ্জাম। সচেতনতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই ‘মৃত্যুফাঁদ’কে নিরাপদ রান্নাঘরে পরিণত করা সম্ভব।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৮/৪/২০২৬