ইরান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম, বিশেষ করে ডিজেলের লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধির পর পণ্যমূল্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে পণ্য ও সেবার দাম যাতে অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সে জন্য সরকারের কঠোর নজরদারি জরুরি।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যা সরাসরি পণ্যমূল্যে প্রতিফলিত হতে পারে। একই সঙ্গে গণপরিবহনের ভাড়াও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকা মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে, যার চাপ বহন করতে হবে সীমিত আয়ের মানুষকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে সরকারের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। তবে এর প্রভাব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে পণ্যমূল্য বাড়বে। আবার কেউ মনে করছেন, অনেক পণ্যের দাম আগেই বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বাড়ানোর যৌক্তিকতা কম।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইরান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে এ সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, জ্বালানির দাম বাড়লে জনজীবনে প্রভাব পড়বে, তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের মূল্যস্ফীতি গত মার্চে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়ালেও নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ায় তা আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে পরিবহন খাতে, যা পরবর্তীতে সব পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। তাই অতিরিক্ত ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের প্রভাব ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে, ফলে নতুন মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ধরনের পার্থক্য নাও দেখা যেতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও কালোবাজারির কারণে ভোক্তাদের প্রকৃত ভোগান্তি আরো বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়ী মহলেও এ সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তৈরি পোশাক খাত, কোল্ড স্টোরেজ এবং পাইকারি বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপবে।
ভোক্তা সংগঠনগুলোর মতে, সরবরাহ সংকটের মধ্যেই দাম বাড়ানো হলে মজুতদাররা আরো উৎসাহিত হতে পারে এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ডিজেল কৃষি, পরিবহন, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হওয়ায় এর প্রভাব বহুমাত্রিক। তাই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতার পাশাপাশি এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সানা/আপ্র/২০/৪/২০২৬