গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

মেনু

ডিজিটাল আয়নার ভেতর মানুষ, সংযুক্তির ভিড়ে একাকীত্বের গল্প

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১১:৩১ পিএম, ০১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৩৮ এএম ২০২৬
ডিজিটাল আয়নার ভেতর মানুষ, সংযুক্তির ভিড়ে একাকীত্বের গল্প
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবি

ভোরের আলো জানালায় পড়ার আগেই শহর জেগে ওঠে এক নীরব শব্দে-স্ক্রিনের আলোয়। অ্যালার্ম থামার আগেই আঙুল চলে যায় মোবাইলের দিকে। একবার স্ক্রল, তারপর আরেকবার। নিউজফিড, শর্ট ভিডিও, নোটিফিকেশন-সব মিলিয়ে দিনের শুরুটা যেন নিজের নয়, কোনো অদৃশ্য জগতের নির্দেশে ঘটে।
কখনো কি মনে হয়, আপনি ফোন খুলছেন, নাকি ফোনই আপনাকে খুলে নিচ্ছে?

এই প্রশ্নটি আজ আর দার্শনিক বিলাসিতা নয়, দৈনন্দিন বাস্তবতা। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়-এটি এক ধরনের জীবন-স্থাপত্য, যেখানে মানুষের সময়, মনোযোগ এবং অনুভূতি ধীরে ধীরে ঢেলে সাজানো হচ্ছে অ্যালগরিদমের হাতে।

বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন দিনে গড়ে কয়েক ঘণ্টা কাটাচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। এই সময়টা আলাদা করে চোখে পড়ে না, কারণ এটি ছড়িয়ে থাকে ছোট ছোট মুহূর্তে-লিফটে দাঁড়িয়ে, বাসে বসে, খাওয়ার টেবিলে, এমনকি ঘুমানোর আগ মুহূর্তেও।

একসময় মানুষের সকালের সঙ্গী ছিল খবরের কাগজ, চায়ের কাপ আর জানালার বাইরে তাকানো কিছুটা নীরবতা। এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্ক্রিন। খবর আসে দ্রুত, ছবি আসে ঝলমলে, জীবন আসে ফিল্টারে মোড়া।

ডিজিটাল সম্পর্কের নতুন ব্যাকরণ: সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কের ভাষা বদলে দিয়েছে। এখন সম্পর্কের প্রথম পরিচয় অনেক সময়ই হয় একটি ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ বা ‘ফলো’ বাটনের মাধ্যমে। দূরের আত্মীয়, হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, অচেনা পরিচিত-সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছে এক অদৃশ্য দেয়ালের ওপাশে, যাকে বলা হয় নিউজফিড।

কিন্তু এই কাছে আসার ভিড়ে কি মানুষ সত্যিই কাছাকাছি এসেছে?

একটি ‘সিন’ অনেক সময় সম্পর্কের নীরব সমাপ্তি। আবার একটি ‘লাইক’ কখনো কখনো হয়ে ওঠে আবেগ প্রকাশের একমাত্র ভাষা। সম্পর্ক এখন আর সময়ের নয়-প্রতিক্রিয়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে।

অ্যালগরিদমের নীরব নিয়ন্ত্রণ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো তার অ্যালগরিদম। এটি ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে তাকে এমন কনটেন্ট দেখায়, যা তাকে বেশি সময় ধরে রাখে। অর্থাৎ এখানে কেবল মানুষই দেখছে না-মানুষকেও দেখা হচ্ছে, বোঝা হচ্ছে, এবং ধীরে ধীরে পরিচালিত করা হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান নয়। এটি কোনো শব্দ করে না, কিন্তু প্রতিদিন মানুষের মনোযোগকে ভাগ করে নেয় অজান্তেই।

তুলনার অদৃশ্য চাপ: ইনস্টাগ্রামের ঝলমলে ছবি, ফেসবুকের সাফল্যের গল্প, টিকটকের বিনোদনের মুহূর্ত-সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক সম্পাদিত বাস্তবতা। এখানে প্রায় সবকিছুই সুন্দর, সফল এবং সাজানো।

এই সাজানো জীবনের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের সাধারণ জীবন অনেকের কাছেই হঠাৎ করে ছোট মনে হতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে বলছেন ‘তুলনার মানসিক চাপ’। এটি ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসকে ক্ষয় করে, জন্ম দেয় অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ।

লাইক, শেয়ার আর আত্মমূল্যের হিসাব: একটি ছবি পোস্ট করার পর নোটিফিকেশন আসে বারবার। কতজন দেখলো, কতজন লাইক দিলো, কে কী মন্তব্য করল-এই সংখ্যা অনেকের কাছে হয়ে ওঠে দিনের মানসিক স্কোরবোর্ড। কিন্তু বাস্তব জীবনের অনুভূতি কি সংখ্যায় ধরা যায়?

একটি মায়ের ভালোবাসা, একজন বন্ধুর উপস্থিতি, বা একটি নিরব সমর্থন-এসবের কোনো লাইক কাউন্টার নেই। তবু ডিজিটাল যুগে ধীরে ধীরে সেই অদৃশ্য জিনিসগুলোই দৃশ্যমান সংখ্যার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

সংযোগের ভিড়ে একাকীত্ব: সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। আমরা এখন সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত, কিন্তু অনেক সময় সবচেয়ে বেশি একা। মানুষ একসঙ্গে বসে থাকে, কিন্তু চোখ থাকে আলাদা স্ক্রিনে। গল্প হয় কম, স্ক্রল হয় বেশি। এই একাকীত্ব দৃশ্যমান নয়, কিন্তু গভীর।

প্রযুক্তি নয়, অভ্যাসের প্রশ্ন: তবু সোশ্যাল মিডিয়া কোনো শত্রু নয়। এটি একটি আয়না-যেখানে আমাদের ব্যবহারই প্রতিফলিত হয়। তথ্য পাওয়া, ব্যবসা করা, শেখা, যোগাযোগ-সবই এখন সহজ হয়েছে এই মাধ্যমে।

সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং আমাদের অভ্যাসে। আমরা কতটা সময় দিচ্ছি, কী দেখছি, কেন দেখছি-এই প্রশ্নগুলোই নির্ধারণ করে প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা প্রযুক্তিকে।

মালিক কে? দিনের শেষে ফোন আবার পাশে রাখা হয়। স্ক্রিন নিভে যায়। কিন্তু কিছু প্রশ্ন জেগে থাকে। আমি কি আমার সময়ের মালিক? নাকি আমার সময়ই এখন কোনো অদৃশ্য জগতের হাতে বন্দি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই পরের সকাল আবার শুরু হয়-একই নীল আলো, একই নীরব স্ক্রল, আর একই গল্পের নতুন পুনরাবৃত্তি।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা।
সানা/আপ্র/১/৭/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

চীন-মার্কিন প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ না সংকট?
০১ জুলাই ২০২৬

চীন-মার্কিন প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ না সংকট?

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ===“রাজনীতি হলো রক্তপাতহীন যুদ্ধ, আর যুদ্ধ হলো রক্তাক্ত রাজনীতি।”-মাও সে তুঙবাংলাদ...

দুর্নীতির সামাজিক জীবন
২৯ জুন ২০২৬

দুর্নীতির সামাজিক জীবন

ড. মতিউর রহমান    দুর্নীতিকে প্রায়ই একটি আইনগত লঙ্ঘন বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেব...

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিল কি প্রতিহিংসা?
২৭ জুন ২০২৬

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিল কি প্রতিহিংসা?

ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্তমেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক (আজীবন) নি...

শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে কেন?
২৭ জুন ২০২৬

শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে কেন?

ড. হারুন রশীদ    বাংলাদেশের প্রতিটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের দৃশ্য প্রায় একই রকম। কাল...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে ধর্ষণের মামলা কিছুটা বেড়েছে বলে যে পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে, তার অন্যতম কারণ হলো এখন ভুক্তভোগীরা সহজেই মামলা করতে পারছেন। আগে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে মামলা করতে পারতেন না বা করতে চাইতেন না। আপনি কি মনে করেন মন্ত্রীর এই বক্তব্য সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 6 ঘন্টা আগে