গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

ডিজিটাল আয়নার ভেতর মানুষ, সংযুক্তির ভিড়ে একাকীত্বের গল্প

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১১:৩১ পিএম, ০১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৭:২১ এএম ২০২৬
ডিজিটাল আয়নার ভেতর মানুষ, সংযুক্তির ভিড়ে একাকীত্বের গল্প
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবি

ভোরের আলো জানালায় পড়ার আগেই শহর জেগে ওঠে এক নীরব শব্দে-স্ক্রিনের আলোয়। অ্যালার্ম থামার আগেই আঙুল চলে যায় মোবাইলের দিকে। একবার স্ক্রল, তারপর আরেকবার। নিউজফিড, শর্ট ভিডিও, নোটিফিকেশন-সব মিলিয়ে দিনের শুরুটা যেন নিজের নয়, কোনো অদৃশ্য জগতের নির্দেশে ঘটে।
কখনো কি মনে হয়, আপনি ফোন খুলছেন, নাকি ফোনই আপনাকে খুলে নিচ্ছে?

এই প্রশ্নটি আজ আর দার্শনিক বিলাসিতা নয়, দৈনন্দিন বাস্তবতা। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়-এটি এক ধরনের জীবন-স্থাপত্য, যেখানে মানুষের সময়, মনোযোগ এবং অনুভূতি ধীরে ধীরে ঢেলে সাজানো হচ্ছে অ্যালগরিদমের হাতে।

বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন দিনে গড়ে কয়েক ঘণ্টা কাটাচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। এই সময়টা আলাদা করে চোখে পড়ে না, কারণ এটি ছড়িয়ে থাকে ছোট ছোট মুহূর্তে-লিফটে দাঁড়িয়ে, বাসে বসে, খাওয়ার টেবিলে, এমনকি ঘুমানোর আগ মুহূর্তেও।

একসময় মানুষের সকালের সঙ্গী ছিল খবরের কাগজ, চায়ের কাপ আর জানালার বাইরে তাকানো কিছুটা নীরবতা। এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্ক্রিন। খবর আসে দ্রুত, ছবি আসে ঝলমলে, জীবন আসে ফিল্টারে মোড়া।

ডিজিটাল সম্পর্কের নতুন ব্যাকরণ: সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কের ভাষা বদলে দিয়েছে। এখন সম্পর্কের প্রথম পরিচয় অনেক সময়ই হয় একটি ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ বা ‘ফলো’ বাটনের মাধ্যমে। দূরের আত্মীয়, হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, অচেনা পরিচিত-সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছে এক অদৃশ্য দেয়ালের ওপাশে, যাকে বলা হয় নিউজফিড।

কিন্তু এই কাছে আসার ভিড়ে কি মানুষ সত্যিই কাছাকাছি এসেছে?

একটি ‘সিন’ অনেক সময় সম্পর্কের নীরব সমাপ্তি। আবার একটি ‘লাইক’ কখনো কখনো হয়ে ওঠে আবেগ প্রকাশের একমাত্র ভাষা। সম্পর্ক এখন আর সময়ের নয়-প্রতিক্রিয়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে।

অ্যালগরিদমের নীরব নিয়ন্ত্রণ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো তার অ্যালগরিদম। এটি ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে তাকে এমন কনটেন্ট দেখায়, যা তাকে বেশি সময় ধরে রাখে। অর্থাৎ এখানে কেবল মানুষই দেখছে না-মানুষকেও দেখা হচ্ছে, বোঝা হচ্ছে, এবং ধীরে ধীরে পরিচালিত করা হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান নয়। এটি কোনো শব্দ করে না, কিন্তু প্রতিদিন মানুষের মনোযোগকে ভাগ করে নেয় অজান্তেই।

তুলনার অদৃশ্য চাপ: ইনস্টাগ্রামের ঝলমলে ছবি, ফেসবুকের সাফল্যের গল্প, টিকটকের বিনোদনের মুহূর্ত-সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক সম্পাদিত বাস্তবতা। এখানে প্রায় সবকিছুই সুন্দর, সফল এবং সাজানো।

এই সাজানো জীবনের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের সাধারণ জীবন অনেকের কাছেই হঠাৎ করে ছোট মনে হতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে বলছেন ‘তুলনার মানসিক চাপ’। এটি ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসকে ক্ষয় করে, জন্ম দেয় অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ।

লাইক, শেয়ার আর আত্মমূল্যের হিসাব: একটি ছবি পোস্ট করার পর নোটিফিকেশন আসে বারবার। কতজন দেখলো, কতজন লাইক দিলো, কে কী মন্তব্য করল-এই সংখ্যা অনেকের কাছে হয়ে ওঠে দিনের মানসিক স্কোরবোর্ড। কিন্তু বাস্তব জীবনের অনুভূতি কি সংখ্যায় ধরা যায়?

একটি মায়ের ভালোবাসা, একজন বন্ধুর উপস্থিতি, বা একটি নিরব সমর্থন-এসবের কোনো লাইক কাউন্টার নেই। তবু ডিজিটাল যুগে ধীরে ধীরে সেই অদৃশ্য জিনিসগুলোই দৃশ্যমান সংখ্যার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

সংযোগের ভিড়ে একাকীত্ব: সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। আমরা এখন সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত, কিন্তু অনেক সময় সবচেয়ে বেশি একা। মানুষ একসঙ্গে বসে থাকে, কিন্তু চোখ থাকে আলাদা স্ক্রিনে। গল্প হয় কম, স্ক্রল হয় বেশি। এই একাকীত্ব দৃশ্যমান নয়, কিন্তু গভীর।

প্রযুক্তি নয়, অভ্যাসের প্রশ্ন: তবু সোশ্যাল মিডিয়া কোনো শত্রু নয়। এটি একটি আয়না-যেখানে আমাদের ব্যবহারই প্রতিফলিত হয়। তথ্য পাওয়া, ব্যবসা করা, শেখা, যোগাযোগ-সবই এখন সহজ হয়েছে এই মাধ্যমে।

সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং আমাদের অভ্যাসে। আমরা কতটা সময় দিচ্ছি, কী দেখছি, কেন দেখছি-এই প্রশ্নগুলোই নির্ধারণ করে প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা প্রযুক্তিকে।

মালিক কে? দিনের শেষে ফোন আবার পাশে রাখা হয়। স্ক্রিন নিভে যায়। কিন্তু কিছু প্রশ্ন জেগে থাকে। আমি কি আমার সময়ের মালিক? নাকি আমার সময়ই এখন কোনো অদৃশ্য জগতের হাতে বন্দি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই পরের সকাল আবার শুরু হয়-একই নীল আলো, একই নীরব স্ক্রল, আর একই গল্পের নতুন পুনরাবৃত্তি।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা।
সানা/আপ্র/১/৭/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুরা কি আমাদের কাছে সব কথা বলতে পারে?
২৯ অক্টোবর ২০২৬

শিশুরা কি আমাদের কাছে সব কথা বলতে পারে?

শফিক আর. ভূঁইয়া====সন্তান স্কুলে যাচ্ছে, মাদ্রাসায় পড়ছে, শিক্ষকের কাছে শিখছে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে নি...

ক্রসফায়ারের ইঙ্গিত: পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি এবং আইনের শাসনের প্রশ্ন
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ক্রসফায়ারের ইঙ্গিত: পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি এবং আইনের শাসনের প্রশ্ন

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির====পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব পালনের অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই অধিকার কি বিচারব...

অনলাইন রেল টিকিটে স্বচ্ছতা কেন জরুরি
২৬ অক্টোবর ২০২৬

অনলাইন রেল টিকিটে স্বচ্ছতা কেন জরুরি

শোয়েব সাম্য সিদ্দিকপূজার দীর্ঘ ছুটি শেষ হয়েছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। আর গ্রামে যাওয়া লা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে