গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মেনু

দুর্নীতির সামাজিক জীবন

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫১ পিএম, ২৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৩৪ এএম ২০২৬
দুর্নীতির সামাজিক জীবন
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ড. মতিউর রহমান    

দুর্নীতিকে প্রায়ই একটি আইনগত লঙ্ঘন বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে আলোচনা করা হয়। সংবাদ শিরোনামে একে ঘুষ, আত্মসাৎ, অর্থ পাচার বা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিন্তু এই ধরনের বর্ণনাগুলো সঠিক হলেও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দুর্নীতি শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এর প্রকৃতি গভীরভাবে সামাজিক। এটি দৈনন্দিন আলাপচারিতায় টিকে থাকে, নাগরিকদের প্রত্যাশাকে রূপ দেয় এবং ব্যক্তিরা কীভাবে জনজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা করে, তাকে প্রভাবিত করে। অন্য কথায়, দুর্নীতির একটি “সামাজিক জীবন” রয়েছে — এটি সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে উৎপাদিত, পুনরুৎপাদিত এবং স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কঠোর আইন ও ঘন ঘন প্রশাসনিক সংস্কার থাকা সত্ত্বেও কেন দুর্নীতি সমাজে একটি স্থায়ী রূপ লাভ করে। এর প্রকৃত উত্তর নিহিত আছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সাথে নাগরিকদের অবচেতন কাঠামোগত অভিযোজনের মধ্যে। যখন কোনো সমাজে নিয়মবহির্ভূত আচরণই টিকে থাকার একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সামাজিকভাবে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে নিছক অপরাধের খতিয়ান হিসেবে না দেখে এর পেছনের গভীর তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলো আলোচনা করা প্রয়োজন।

অনেক উন্নয়নশীল সমাজে দুর্নীতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং একটি পুনরাবৃত্ত অভিজ্ঞতা। পাসপোর্ট তৈরি, জমি নিবন্ধন, পুলিশি সহায়তা, ব্যবসায়িক লাইসেন্স এবং সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক পরিষেবাগুলো গ্রহণ করার সময় নাগরিকরা প্রতিনিয়ত এর সম্মুখীন হন। সমাজবিজ্ঞানী ব্লেক আশফোর্ড এবং বিকাশ আনন্দ তাদের যৌথ গবেষণায় দুর্নীতির এই ধারাটিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের বিখ্যাত রচনা ‘নরমালইজিং অর্গানাইজেশনাল করাপশন’; যা ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়, সেখানে তারা দেখিয়েছেন কীভাবে অনিয়ম বা অনৈতিক আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই তত্ত্ব অনুসারে, যখন কোনো অনিয়ম বারবার ঘটতে থাকে, তখন সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সদস্যরা তাকে আর বিচ্যুতি হিসেবে দেখে না। বরং সামাজিকভাবে তাকে একটি বাস্তব প্রয়োজনীয়তা বা টিকে থাকার কৌশল হিসেবে মেনে নেয়। নিয়মকানুন আনুষ্ঠানিকভাবে কাগজে-কলমে অক্ষুণ্ন থাকে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক প্রথাগুলো সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ছাপিয়ে যায়। এই স্বাভাবিকীকরণ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ধারণা বা তাত্ত্বিক অনুমান নয়, বরং বাস্তব পরিসংখ্যানও এর সপক্ষে ভয়াবহ সাক্ষ্য দেয়।

২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘জাতীয় গৃহস্থালি সমীক্ষা ২০২৩’ নামক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের ৭০.৯ শতাংশ পরিবার সরকারি বা বেসরকারি পরিষেবা গ্রহণের সময় কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং প্রায় ৫০.৮ শতাংশ পরিবার সরাসরি ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এই সমীক্ষায় আরও অনুমান করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই দেশের পরিবারগুলো ১০,৯০০ কোটি টাকার বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে এবং ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের মোট বোঝা প্রায় ১.৪৬ লক্ষ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি কেবল উচ্চপর্যায়ের অভিজাতদের কেলেঙ্কারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি লক্ষ লক্ষ সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

বৈশ্বিক পর্যায়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও সুশাসনের ঘাটতির মাত্রা আরও স্পষ্ট হয় আন্তর্জাতিক সূচকগুলোর দিকে তাকালে। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪ স্কোর করেছে; যা বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর থেকে অনেক নিচে। বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় ১৫০তম; যা সুশাসনের ক্ষেত্রে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতার ইঙ্গিত দেয়। এই সূচকটি মূলত বিশ্বব্যাংকের সুশাসন সূচক এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের উপাত্তসহ একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক ডেটাসেট ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের এই স্কোর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ২০-এর ঘরে স্থির থাকা মূলত সাময়িক কোনো সংকটের লক্ষণ নয়, বরং এটি সমাজে দুর্নীতির গভীর কাঠামোগত রূপ ধারণ করার প্রমাণ।

অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ তার ১৯৯০ সালে প্রকাশিত যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘ইনস্টিটিউশনস, ইনস্টিটিউশনাল চেঞ্জ অ্যান্ড ইকোনমিক পারফরম্যান্স’-এ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর গুরুত্ব বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। তার মতে, প্রতিষ্ঠান হলো সমাজের মূল খেলার নিয়ম, যা মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক লেনদেনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এই আনুষ্ঠানিক নিয়মগুলো বা খেলার নিয়মগুলো ভেঙে পড়ে বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, তখন সমাজে আস্থার সংকট তৈরি হয়। একবার এই প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হলে, নাগরিকরা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার পরিবর্তে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। তখন তারা নিজেদের কাজ হাসিল করার জন্য ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক যেমন আত্মীয়স্বজন, মধ্যস্থতাকারী দালাল বা রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে বাধ্য হয়। এই অনানুষ্ঠানিক নির্ভরশীলতার বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিউ-এর সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের মাধ্যমে আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব। তিনি তার ১৯৮৬ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য ফর্মস অব ক্যাপিটাল’-এ সামাজিক পুঁজির ধারণাটি তুলে ধরেন।

বুর্দিউ-এর মতে, সামাজিক পুঁজি হলো এমন এক ধরনের নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা ব্যক্তি তার সামাজিক অবস্থান মজবুত করতে বা সুবিধা লাভ করতে ব্যবহার করে। যখন একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায্যতার ভিত্তিতে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকরা এই অনানুষ্ঠানিক সামাজিক পুঁজি ব্যবহার করে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে সমাজে এমন একটি স্ব-শক্তিবর্ধক চক্র বা ফাঁদ তৈরি হয় যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস নতুন দুর্নীতির জন্ম দেয় এবং সেই দুর্নীতি আবার প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে তোলে।

দুর্নীতি সামাজিকভাবে কখনো নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে না, বরং সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ধনী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য দুর্নীতি বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান প্রায়ই একটি সামান্য অতিরিক্ত খরচ মাত্র; যা তারা সহজেই সামাল দিতে পারে বা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু নিম্ন আয়ের প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য এটি মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। একটি ছোট অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান বা ঘুষের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে দেয় একজন দরিদ্র মানুষের পাসপোর্ট সময়মতো হবে কি না, হাসপাতালে তার জরুরি চিকিৎসা সম্পন্ন হবে কি না কিংবা তার জমিজমা বিরোধের সঠিক সমাধান হবে কি না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর ২০২৩ সালের গৃহস্থালি সমীক্ষা এটি নিশ্চিত করে যে, দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মোট আয়ের অনুপাতে ধনীদের চেয়ে অনেক বেশি হারে ঘুষের বোঝা বহন করে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ তার ২০১২ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য প্রাইস অব ইনইকুয়ালিটি”-তে এই ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্যের উৎস ও ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। স্টিগলিটজের তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম কার্যকরভাবে দুর্নীতিকে একটি পশ্চাৎমুখী সামাজিক করে পরিণত করে। প্রগতিশীল কর ব্যবস্থায় যেখানে ধনীদের বেশি কর দেওয়ার কথা, সেখানে দুর্নীতির এই পশ্চাৎমুখী কর ব্যবস্থার কারণে দরিদ্ররা বেশি শোষিত হয়। এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে বিশেষ সুবিধায় এবং সাধারণ প্রবেশাধিকারকে পণ্যে পরিণত করে সমাজের অভ্যন্তরীণ বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। বিশ্বব্যাংকও তাদের বিভিন্ন সময়কালীন সুশাসন বিষয়ক প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করেছে যে, দুর্নীতি মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থেকে সরকারি সম্পদ অপসারিত করে দরিদ্র মানুষের কল্যাণ ব্যাহত করে এবং দারিদ্র্য হ্রাসের জাতীয় কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে তোলে।

দুর্নীতির এই সামাজিক বিস্তৃতি কেবল একটি অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এটি সামাজিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। একটি সমাজের শিশু এবং তরুণরা কোনো তাত্ত্বিক নির্দেশনার চেয়ে বাস্তব পরিবেশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নৈতিকতা শেখে। তারা যখন প্রতিনিয়ত বাস্তব সমাজে দেখে যে কঠোর পরিশ্রম, মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে অবৈধ প্রভাব, অর্থ এবং অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি, তখন তারা জীবনের এক বিকৃত আদর্শকে অবচেতনভাবেই আত্মস্থ করে ফেলে। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মারটন তার ১৯৩৮ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সোশ্যাল স্ট্রাকচার অ্যান্ড অ্যানোমি’তে এই সামাজিক অবস্থাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। মারটনের তত্ত্ব অনুসারে, যখন সমাজ তার সদস্যদের সামনে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা সফলতার রূপরেখা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক বা ন্যায়সঙ্গত উপায়গুলোর কার্যকারিতা সমাজ থেকে হারিয়ে যায়, তখন সমাজে এক ধরনের আদর্শহীনতা বা বিচ্যুতির সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সামাজিক নিয়মকে তোয়াক্কা না করে যেকোনো উপায়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবৈধ পথ বেছে নেয়।

তরুণ সমাজের মধ্যে যখন এই মানসিকতা তৈরি হয়, তখন তারা মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার চেয়ে ক্ষমতার সংযোগ বা অবৈধ সুযোগের পেছনে দৌড়ানোকেই যৌক্তিক মনে করে। যে সমাজে দুর্নীতি চারদিকে ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং অপরাধের জন্য কোনো দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা হয় না, সেখানে ব্যক্তিরা এমন এক ধরনের অভিযোজিত কৌশল তৈরি করে যা আনুষ্ঠানিক আইনের চেয়ে সমাজে টিকে থাকাকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। সমাজবিজ্ঞানীরা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, এটি কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ত্রুটি নয়, বরং এটি হলো রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সাথে নাগরিকদের এক ধরনের কাঠামোগত বাধ্যবাধকতামূলক অভিযোজন।

যেসব সমাজে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল বা চরমভাবে রাজনীতিকৃত, সেখানেই দুর্নীতির এই সামাজিক জীবন সবচেয়ে বেশি ডালপালা মেলে। অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা, স্বচ্ছতার অভাব, সীমিত জবাবদিহিতার ব্যবস্থা এবং মেধার অবমূল্যায়ন করে রাজনীতিকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়া ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্তহীন সুযোগ তৈরি করে। অর্থনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হয় রেন্ট-সিকিং বা উৎপাদনহীন উপায়ে সম্পদ আহরণের প্রবণতা। অর্থনীতিবিদ অ্যান ক্রুগার তার ১৯৭৪ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব দ্য রেন্ট-সিকিং সোসাইটি’তে এই প্রক্রিয়াটি বিস্তারিত তুলে ধরেন। তার তত্ত্ব অনুসারে, যখন কোনো অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় উৎপাদনশীল কাজ না করে কেবল লাইসেন্স, পারমিট বা কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতার জোরে বাড়তি মুনাফা বা সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তখন তাকে রেন্ট-সিকিং বলা হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৫-এর দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার অভাব এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিচারিক জবাবদিহিতার ব্যবস্থার কারণেই এই রেন্ট-সিকিং প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত টিআইবি-র খাতভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ক্রয় সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে দেশের বড় বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পে ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং পারস্পরিক যোগসাজশের কারণে কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পেই প্রায় ২,৯০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। অর্থনীতিবিদ অলিভার উইলিয়ামসন তার ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ইকোনমিক ইনস্টিটিউশনস অব ক্যাপিটালিজম’-এ লেনদেন ব্যয় তত্ত্ব আলোচনা করেছেন। উইলিয়ামসনের এই তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, যখন প্রাতিষ্ঠানিক সততার অভাব ঘটে এবং রেন্ট-সিকিং বৃদ্ধি পায়, তখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক বিশাল অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা সামগ্রিক লেনদেনের অদৃশ্য ব্যয় বা খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি লেনদেন ব্যয় দেশের উৎপাদনশীল খাতের গতি কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধিকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে।

বর্তমান যুগে দুর্নীতি হ্রাসের একটি প্রধান আধুনিক কৌশল হিসেবে ডিজিটাল সুশাসন বা প্রযুক্তির ব্যবহারকে বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। অনলাইন আবেদন, ই-পেমেন্ট এবং স্বয়ংক্রিয় সেবা প্রদান ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিকদের মুখোমুখি আলাপচারিতা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, যা তাত্ত্বিকভাবে ঘুষ বা তাৎক্ষণিক অনিয়মের সুযোগ সীমিত করার কথা। কিন্তু সমাজ ও প্রযুক্তির এই মিথস্ক্রিয়া নিয়ে গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত মিশ্র ফলাফল দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষক সাহা এবং তার সহগবেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ডিজিটাইজেশন কিছু ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের ছোটখাটো দুর্নীতি বা নগদ অর্থের লেনদেন কমাতে সক্ষম হলেও, এটি মূলত এক নতুন ধরনের পদ্ধতিগত অস্বচ্ছতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেখানে সাধারণ প্রান্তিক মানুষ সরাসরি প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নয়, সেখানে একদল নতুন অনানুষ্ঠানিক ডিজিটাল মধ্যস্থতাকারীর জন্ম হয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে ডিজিটাল সিস্টেমে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই পরিস্থিতিটি প্রমাণ করে যে, কেবল বাহ্যিক প্রযুক্তির পরিবর্তন করলেই দুর্নীতি দূর হয় না, যদি না মানুষের দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির আমূল সংস্কার করা সম্ভব হয়। ফলে দুর্নীতি সমাজ থেকে একেবারে বিলুপ্ত না হয়ে কেবল নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিজের রূপ পরিবর্তন করে চলেছে। এই সার্বিক পরিস্থিতি সমাজে এক গভীর বৈধতার সংকট ও রাজনৈতিক হতাশার জন্ম দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে চলমান মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের চেয়েও দুর্নীতি অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে জনগণের ক্ষোভ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে এক গভীর নৈতিক অসন্তোষকে প্রতিফলিত করে। যখন নাগরিকরা ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতিকে দেশের প্রধানতম সংকট হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে যে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর প্রতি জনগণের এক গভীর আস্থা ও বৈধতার সংকট তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাই দৃঢ় হয় যে, দেশের প্রচলিত আইন বা নিয়মকানুন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়; বরং তা কেবল সাধারণ ও ক্ষমতাহীনদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

দুর্নীতির সামাজিক জীবনের এই বিস্তারিত তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিশ্লেষণ থেকে এটি অত্যন্ত সুষ্পষ্ট যে, দুর্নীতিকে কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আইনি ধারা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এটি মূলত একটি গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের সংকট। দুর্নীতি সমাজে টিকে থাকে এবং শক্তিশালী হয় কারণ এটি মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক প্রত্যাশা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসের গভীরে নিজের শিকড় গেড়ে নিয়েছে। তাই এর বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করার জন্য কেবল আদালতের কাঠগড়ায় শাস্তির ভয় দেখানোর চেয়েও অনেক বেশি কিছু প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার শৃঙ্খলাকে নতুন করে পুনর্গঠন করা।

ডগলাস নর্থের প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বলা যায়, আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক নিয়ম বা আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজের অনানুষ্ঠানিক নৈতিক রীতিনীতিকেও ইতিবাচকভাবে রূপান্তর করতে হবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীন জবাবদিহিতা, স্বাধীন বিচারিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে সাধারণ নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমাজে এমন এক নৈতিক আদর্শের পুনরুদ্ধার ও সামাজিক স্বীকৃতি, যা ক্ষমতার সংযোগ বা অন্যায় প্রভাবের পরিবর্তে ব্যক্তির সততা, মেধা এবং যোগ্যতাকে পুরস্কৃত করবে।

দুর্নীতি কেবল রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে কিছু অর্থ চুরি যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি মূলত একটি রাষ্ট্রের সাথে তার নাগরিকদের এবং নাগরিকদের সাথে নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থার সামাজিক চুক্তি ভেঙে যাওয়ার নাম। এটি সমাজে সামগ্রিক ন্যায্যতার পরিবর্তে একচ্ছত্র পক্ষপাতিত্ব, মেধার পরিবর্তে অবৈধ বিশেষাধিকার এবং প্রকৃত নাগরিকত্বের অধিকারের পরিবর্তে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতাকে প্রতিস্থাপন করে। তাই দুর্নীতি মোকাবেলার মূল লক্ষ্য কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস করা নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সেই নৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিটিকে পুনরায় গড়ে তোলা, যা সৎ ও ন্যায়ভিত্তিক জীবনযাপনকে একটি স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আপ্র/কেএমএএ/২৯.০৬.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিল কি প্রতিহিংসা?
২৭ জুন ২০২৬

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিল কি প্রতিহিংসা?

ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্তমেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক (আজীবন) নি...

শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে কেন?
২৭ জুন ২০২৬

শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে কেন?

ড. হারুন রশীদ    বাংলাদেশের প্রতিটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের দৃশ্য প্রায় একই রকম। কাল...

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের অযোগ্যতা ঢাকার ‘মহৌষধ’ যখন শিক্ষার্থী নির্যাতন
২৪ জুন ২০২৬

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের অযোগ্যতা ঢাকার ‘মহৌষধ’ যখন শিক্ষার্থী নির্যাতন

আলমগীর খান===আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নকল বন্ধে অসম্ভবরকম খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু নকল রোগের লক্ষণ, র...

ইরান যুদ্ধে কে হারল, কে জিতল?
২৪ জুন ২০২৬

ইরান যুদ্ধে কে হারল, কে জিতল?

মহসীন হাবিব===    অবশেষে ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট বিতর্ক ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট আবেদনটি ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত ও হেয় প্রতিপন্ন করার একটি প্রচেষ্টা। আপনি কি মনে করেন চিফ প্রসিকিউটরের মন্তব্য সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 23 ঘন্টা আগে