একটি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীরে কিছু নাম এমনভাবে গেঁথে যায়, যা কেবল ব্যক্তির পরিচয় নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। মুস্তাফা মনোয়ার তেমনই এক নাম। তাঁর প্রয়াণে নিভে গেছে সৃজনের এক দীপশিখা, কিন্তু একই সঙ্গে আরো তীব্রভাবে সামনে এসেছে সেই প্রশ্ন-আমরা কীভাবে সংরক্ষণ করব আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যাঁরা এই জাতির সাংস্কৃতিক মানচিত্র এঁকে গেছেন?
মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বহুমাত্রিক সৃজনের এক অনন্য উদাহরণ। চিত্রশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্পগবেষক, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ-এই পরিচয়গুলোর প্রতিটিই আলাদা করে তাঁর প্রতিভাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না, বরং একত্রে তাঁকে একটি সৃজনধারার মহীরুহ হিসেবে উপস্থাপন করে। তাঁর জীবন ছিল শিল্পের মাধ্যমে জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। তিনি শিল্পকে কেবল ক্যানভাস বা মঞ্চে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তাকে নিয়ে গেছেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, শিশুদের স্বপ্নে, রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক কাঠামোর গভীরে।
ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে কিশোর বয়সে প্রতিবাদের কার্টুন আঁকার মধ্য দিয়ে তাঁর যে যাত্রা শুরু, তা কেবল ব্যক্তিগত শিল্পচর্চা ছিল না, ছিল সময়ের সঙ্গে শিল্পের সক্রিয় সংলাপ। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংস্কৃতিক সংগ্রামে তাঁর অংশগ্রহণ সেই অবস্থানকেই আরো দৃঢ় করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্প কেবল নান্দনিকতার বাহন নয়; এটি জাতীয় চেতনা জাগ্রত করার শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁর তুলির রেখা যেমন ছিল সংক্ষিপ্ত, তেমনি ছিল গভীর অর্থবহ; অল্প রং ও অল্প রেখায় তিনি যে বক্তব্য নির্মাণ করেছেন, তা বহু দশক পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের টেলিভিশন, নাট্যচর্চা এবং শিশুতোষ সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান এক অনন্য অধ্যায়। পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলা, শিশুদের জন্য মানসম্মত অনুষ্ঠান নির্মাণ, নাট্যনির্মাণে নতুন ভাষা সৃষ্টি-সব মিলিয়ে তিনি সংস্কৃতিকে কেবল বিনোদনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি, বরং একে জাতি গঠনের মৌলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ও ধারণা আন্তর্জাতিক পরিসরেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, যা বাংলাদেশের সৃজনশীল সক্ষমতার এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব। বিভিন্ন সময়ে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচালনা করেছেন এক দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। শিল্পকে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থেকেও কীভাবে সৃজনশীল ও মানবিক রাখা যায়, তিনি তার বাস্তব উদাহরণ রেখে গেছেন। এ কারণেই তিনি কেবল শিল্পী নন, ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক নির্মাতা।
তাঁ প্রয়াণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবং দেশজুড়ে যে শ্রদ্ধার ঢল নেমেছে, তা প্রমাণ করে-তিনি কেবল একটি গোষ্ঠী বা প্রজন্মের নন, তিনি সমগ্র জাতির। নাট্যব্যক্তিত্ব, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ-সবাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, কারণ তিনি তাঁদের সবার সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
তবু এই শোকের মধ্যেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো উত্তরাধিকার নিয়ে। আমরা কি কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা ও স্মরণসভায় সীমাবদ্ধ থাকব, নাকি তাঁর সৃজনকর্মকে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক নীতির অংশে পরিণত করব? বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে অনেক গুণীজনের কাজ সময়ের সঙ্গে বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের কাজ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের যথাযথ কাঠামো এখনও দুর্বল।
এখন প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার, যেখানে মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পকর্ম, পাপেট, নাট্যনির্মাণ, গবেষণা ও দর্শনকে নথিভুক্ত ও সংরক্ষণ করা হবে। তাঁর নামে গবেষণা কেন্দ্র, বার্ষিক স্মারক বক্তৃতা, শিল্পবৃত্তি এবং শিশু সংস্কৃতি উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাক্রমে তাঁর অবদানকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, কীভাবে একজন শিল্পী একটি জাতির সাংস্কৃতিক মানচিত্র নির্মাণ করেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের প্রস্থান কোনো সমাপ্তি নয়; এটি একটি নতুন দায়বোধের সূচনা। কারণ যে শিল্পী জাতির সাংস্কৃতিক মানচিত্র এঁকে গেছেন, তাঁর স্মৃতি কেবল অতীতের বিষয় নয়, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও বটে। তাঁর সৃষ্ট দীপ নিভে গেলেও, সে দীপের আলো আমাদের সাংস্কৃতিক পথচলায় দীর্ঘদিন প্রেরণা জোগাবে-যদি আমরা সেই আলোকে ধারণ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি।
সানা/আপ্র/১/৭/২০২৬