গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৪৬ পিএম, ২৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩৪ এএম ২০২৬
যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়
ছবি

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ একটি গভীর জাতীয় উদ্বেগের বিষয় -ফাইল ছবি

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল, জনসমাবেশের ভিড় কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে সত্য বলার সাহস, সমালোচনা সহ্য করার সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতায়। আর সেই স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান বাহক সাংবাদিক। তাই কোনো সাংবাদিক যখন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অপমানিত, হেনস্তা কিংবা আক্রান্ত হন, তখন ক্ষতবিক্ষত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন; আঘাতপ্রাপ্ত হয় জনগণের জানার অধিকার, দুর্বল হয়ে পড়ে গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ সেই কারণেই একটি গভীর জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, সংবাদ সংগ্রহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। আহত হন সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান শিশির; হামলা ও হেনস্তার শিকার হন আরো কয়েকজন সংবাদকর্মী। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকদের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আচরণ করা হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। 
    
ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল দুঃখ প্রকাশ করেছে, তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি অবশ্যই একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দায়বদ্ধতা কেবল বিবৃতি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং দৃশ্যমান প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে। হামলাকারী যে-ই হোক, তিনি দলীয় কর্মী, সমর্থক, অনুপ্রবেশকারী কিংবা বহিরাগত-এই বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবেশে সাংবাদিক কেন নিরাপদ থাকলেন না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কীভাবে প্রতিরোধ করা হবে।

আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা ব্যবহার করে বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার প্রবণতা। একজন সাংবাদিক কোনো দলের কর্মী নন, কোনো মতাদর্শের প্রচারকও নন; তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে প্রশ্ন করেন, তথ্য সংগ্রহ করেন এবং ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। সংবাদকর্মীর প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখা কিংবা ভিন্নমতকে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা একটি অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। এ সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, রাজনৈতিক দলগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ সমালোচনা গ্রহণের ক্ষমতা হারালে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তিও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও পর্যালোচনার দাবি রাখে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। যদি এমন অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ জনসমাগমে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রেরও সাংবিধানিক ও নৈতিক কর্তব্য।

বাংলাদেশ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন রাজনৈতিক পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অনভিপ্রেত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে রাজনৈতিক সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের পরীক্ষাপত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সত্যকে আঘাত করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি কখনো দীর্ঘস্থায়ী মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি হলো-যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়; আর যেখানে সত্য নিরাপদ নয়, সেখানে গণতন্ত্রও কখনো নিরাপদ থাকতে পারে না।
সানা/আপ্র/২৬/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে