গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

মেনু

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:৪৫ পিএম, ২৩ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২২:২১ এএম ২০২৬
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?
ছবি

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন -ফাইল ছবি

একটি রাষ্ট্রের করব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়, সাম্য ও সক্ষমতাভিত্তিক অবদান। যে নাগরিকের আয় বেশি, তার অবদানও বেশি হবে-এটাই আধুনিক অর্থনীতির স্বীকৃত নীতি। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগের জন্ম দেয়। কারণ কর কাঠামোর পরিবর্তনে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই চাপ কতটা যৌক্তিক?

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি আজ এক বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে অবস্থান করছে। তারা দরিদ্র নয় বলে রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আসে না, আবার ধনীও নয় যে মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা ব্যয়, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা আবাসন খরচের ঊর্ধ্বগতিকে সহজে সামাল দিতে পারবে। গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় আয় বাড়েনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, সন্তানের শিক্ষাব্যয়, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন খরচ-সবকিছুর চাপ এসে জমা হয়েছে মধ্যবিত্তের কাঁধে। এই শ্রেণিটিই সবচেয়ে বেশি কর দেয়, সবচেয়ে বেশি নিয়ম মেনে চলে এবং রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। অথচ সংকটের সময় তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়।

সিপিডির বিশ্লেষণ বলছে, ৬ থেকে ১৫ লাখ টাকা বার্ষিক করযোগ্য আয়ের ব্যক্তিদের করদায় সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের মানুষের করের বোঝা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম। এই বাস্তবতা করনীতির মৌলিক দর্শনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। কারণ কর আরোপের উদ্দেশ্য কেবল রাজস্ব সংগ্রহ নয়; বরং সামাজিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, এই কর বৃদ্ধি এমন এক সময়ে আসছে যখন কর্মসংস্থানের বাজার এখনো প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির অপেক্ষায়, আর যারা কর্মে নিয়োজিত, তাদের অনেকেই প্রকৃত আয়ের অবমূল্যায়নের শিকার। মূল্যস্ফীতি তাদের বেতন ও সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমিয়ে দিয়েছে। ফলে করের অতিরিক্ত চাপ তাদের জীবনের অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, মধ্যবিত্ত দুর্বল হলে অভ্যন্তরীণ বাজারও দুর্বল হয়। এই শ্রেণির ভোগক্ষমতা কমে গেলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা কোনো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল হতে পারে না। বরং কর ফাঁকি রোধ, করজালের বিস্তার, অপ্রদর্শিত সম্পদের ওপর কার্যকর নজরদারি এবং উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাজস্ব বৃদ্ধির অধিকতর কার্যকর পথ।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোও জরুরি। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি সবচেয়ে বেশি দিতে হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে, তবে তা ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন বলা কঠিন। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র কখনো তার সবচেয়ে অনুগত ও নিয়ম মেনে চলা নাগরিকদের অতিরিক্ত চাপে ফেলতে পারে না।

বাজেট চূড়ান্ত করার আগে তাই কর কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। কারণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি মধ্যবিত্ত; তাদের স্বস্তি মানে অর্থনীতির স্বস্তি, তাদের আস্থা মানে রাষ্ট্রের শক্তি। যে বাজেট মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস বাড়ায়, সে বাজেট রাজস্ব বাড়াতে পারলেও জনআস্থা অর্জন করতে পারে না। আজ সেই বাস্তব সত্যই সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। 
সানা/আপ্র/২৩/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ
২২ জুন ২০২৬

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ

প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠা...

শুধু পোশাকের পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা
২১ জুন ২০২৬

শুধু পোশাকের পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা

রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং জননিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি পুলিশ বাহিনী। কিন্তু দুর্ভাগ...

তরুণদের ঘিরে তামাকের নতুন ফাঁদ, নিয়ন্ত্রণে নতুন ভাবনার অনিবার্যতা
২০ জুন ২০২৬

তরুণদের ঘিরে তামাকের নতুন ফাঁদ, নিয়ন্ত্রণে নতুন ভাবনার অনিবার্যতা

বাংলাদেশ উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও তামাক নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে নত...

অপরাধের ছায়ারাজ্য মোহাম্মদপুর, রাজধানীর হৃদয়ে আইনের শাসনের চ্যালেঞ্জ
১৯ জুন ২০২৬

অপরাধের ছায়ারাজ্য মোহাম্মদপুর, রাজধানীর হৃদয়ে আইনের শাসনের চ্যালেঞ্জ

রাজধানী ঢাকা একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন

সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে তাকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত রোববার (২১ জুন) বিকেলে সিলেট নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় ‘সিলেটের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। আপনি কি মনে করেন এই মানববন্ধন ও দাবি সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 21 ঘন্টা আগে