বাংলাদেশ উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও তামাক নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে নতুন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে কর বৃদ্ধি, আইনগত বিধিনিষেধ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালিত হলেও ধূমপানের প্রবণতা প্রত্যাশিত হারে কমছে না। বরং তামাকের ব্যবহার ক্রমেই নতুন রূপ ধারণ করছে। সস্তা সিগারেট, খুচরা শলাকা, ধোঁয়াবিহীন তামাক এবং দ্রুত বিস্তারমান ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের মাধ্যমে নিকোটিনের আসক্তি নতুন প্রজন্মকে ঘিরে ফেলছে। এটি কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন-অভিযাত্রার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কর বৃদ্ধি সত্ত্বেও অধিকাংশ তরুণ ধূমপানের পরিমাণ কমায়নি। অনেকে বরং কম দামের ব্র্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে বা বিকল্প তামাকপণ্যের দিকে ঝুঁকেছে। এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে-বর্তমান করনীতি আংশিক কার্যকর হলেও তা আচরণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হচ্ছে না। আসক্তিপ্রবণ পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তার সিদ্ধান্ত কেবল মূল্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না; সহজলভ্যতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, বিপণন কৌশল এবং বিকল্প পণ্যের উপস্থিতিও সমানভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে কর বৃদ্ধি যদি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত না হয়, তবে কাঙিক্ষত ফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, ধূমপানের ব্যয় নির্বাহ করতে তরুণদের একটি অংশ খাদ্য, যাতায়াত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের প্রশ্ন নয়; বরং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। যখন একজন তরুণ নিজের পুষ্টি, শিক্ষা বা প্রয়োজনীয় জীবনযাপনের ব্যয় সংকুচিত করে আসক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তা রাষ্ট্রের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা উন্নয়নের সম্ভাবনা ক্ষুণ্ন হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ই-সিগারেট ও ভেপিংয়ের বিস্তার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রচলিত সিগারেটবিরোধী নীতির ফাঁক গলে এসব পণ্য তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আকর্ষণীয় স্বাদ, আধুনিক জীবনধারার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা এ প্রবণতাকে আরো ত্বরান্বিত করছে। বাস্তবে এগুলো নিকোটিন নির্ভরতার নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের ভিত্তি তৈরি করছে। বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশকেও সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে।
তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো-এটি কেবল রাজস্বনীতি বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক জাতীয় কর্মসূচি হওয়া প্রয়োজন। কর কাঠামোকে সহজ ও কার্যকর করা, খুচরা শলাকা বিক্রি বন্ধ করা, বাজারে নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা, ভেপিং ও ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, স্থানীয় সরকার ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে তামাকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ধূমপান কমানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসচেতনতা সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, আইন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু সচেতনতা মানুষকে পরিবর্তন করে। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ কৌশলে আচরণগত পরিবর্তন, জনশিক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ গঠনের যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নের জন্য এখন আর খণ্ডিত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং কঠোরভাবে বাস্তবায়নযোগ্য নীতিকাঠামো। কারণ আজকের তরুণদের যদি নিকোটিনের নতুন ফাঁদ থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে আগামী দিনের সুস্থ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও ক্রমশ দূরে সরে যাবে।
সানা/আপ্র/২০/৬/২০২৬