বর্ষার মেঘ এখনও পুরোপুরি আকাশ দখল করেনি, অথচ ডেঙ্গুর অশনি সংকেত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় চার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন; শেষ দশ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় সাতশ জন। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। এই বাস্তবতা কেবল একটি মৌসুমি রোগের বিস্তারের খবর নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির কার্যকারিতা নিয়ে এক কঠিন প্রশ্নপত্র।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিপুল ব্যয়ের পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য মিলছে না। গত এক দশকে মশা নিয়ন্ত্রণে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে। ড্রোন ব্যবহার, সচেতনতামূলক প্রচার, জৈবিক পদ্ধতি প্রয়োগ কিংবা ফগিং কার্যক্রম-সবই হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, ফল কোথায়? নাগরিকেরা এখনও মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ, হাসপাতালগুলো এখনও ডেঙ্গু রোগীতে ভরে যায়, আর প্রতি বর্ষায় একই আতঙ্ক ফিরে আসে। অর্থাৎ সমস্যাটি অর্থের ঘাটতিতে নয়; সমস্যাটি পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহির ঘাটতিতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা ও নির্দেশনা বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল রাসায়নিক ফগিং কখনোই যথেষ্ট নয়। কার্যকর প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত মশা ব্যবস্থাপনা, যেখানে রোগতাত্ত্বিক তথ্য, মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জীববৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণ, জনসম্পৃক্ততা এবং লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান একসঙ্গে পরিচালিত হবে। সংস্থাটি আরো সতর্ক করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে এডিসবাহিত রোগের ঝুঁকি বিশ্বব্যাপী বাড়ছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও সেই বৈশ্বিক চিত্রের বাইরে নয়। রাজধানীর নির্মাণাধীন ভবন, বহুতল আবাসন, ছাদের টব, প্লাস্টিকের ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত পাত্র এবং বর্জ্য জমার স্থানগুলো এখন এডিস মশার নিরাপদ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মশা নিধনের চেয়ে মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা অধিক কার্যকর ও টেকসই পদ্ধতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উৎসস্থল ধ্বংস, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং তথ্যভিত্তিক নজরদারিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাস্তবে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার অভাব। রাজধানীর একটি সিটি কর্পোরেশন জরিপ চালিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করলেও অন্যটি এখনও সেই পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করেনি। অথচ আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় তথ্যই হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান ভিত্তি। কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, কোন কীটনাশক কার্যকর-এসব তথ্য ছাড়া পরিচালিত কর্মসূচি অনেকাংশেই অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার শামিল।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডভিত্তিক বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মশা নিয়ন্ত্রণ খাতে ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যকে একই নীতিকাঠামোর আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত, স্কুল, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন এবং ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটিকে সম্পৃক্ত করে স্থায়ী জনসম্পৃক্ততা গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শের ভিত্তিতে কীটনাশক ব্যবহারের কৌশল নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।
ডেঙ্গু আজ আর কেবল স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়; এটি নগর শাসনব্যবস্থার সক্ষমতারও পরীক্ষা। প্রতি বছর সংকট দেখা দেওয়ার পর তড়িঘড়ি অভিযান চালানো কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজন সারা বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি, কঠোর জবাবদিহি এবং সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় ব্যয়ের অঙ্ক বাড়বে, সভা-সেমিনার বাড়বে, কর্মসূচির তালিকা দীর্ঘ হবে; কিন্তু ডেঙ্গুর ছায়া থেকে মুক্তি মিলবে না। এখন সময় এসেছে লোকদেখানো উদ্যোগের গণ্ডি পেরিয়ে কার্যকর, টেকসই এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার
সানা/আপ্র/১৭/৬/২০২৬