বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতি একসঙ্গে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের মন্থর গতি, ব্যাংক খাতের আস্থাসংকট, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানের চাপ-সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর জমেছে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বোঝা। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দলিল। কিন্তু বাজেটের প্রকৃত শক্তি তার আকারে নয়; শক্তি নিহিত থাকে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতায়।
সরকার বলছে, এই বাজেটের মূল দর্শন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক অর্থনীতি নির্মাণ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়াও সময়োপযোগী। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ বাজেটকে মূল্যায়ন করেন অন্য এক মানদণ্ডে-বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না, কর্মসংস্থান বাড়বে কি না, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমবে কি না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও দূর হবে কি না। সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফলও অনেকাংশে ম্লান হয়ে যাবে। কারণ মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে নির্মম আঘাত হানে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
রাজস্ব আহরণ নিয়েও রয়েছে বড় সংশয়। প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা গেছে। নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ-প্রায় সব ক্ষেত্রেই কঠিন চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ব্যবসার পরিবেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় মূলত বেসরকারি খাতে; কেবল কর ছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করেই কর্মসংস্থানের ভিত্তি গড়ে তুলতে হয়।
বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঋণনির্ভরতা। প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি এবং বিপুল সুদ পরিশোধের দায় আগামী বছরগুলোতে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। উন্নয়ন ব্যয় তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানে রূপ নেবে। অন্যথায় বৃহৎ ব্যয় নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন।
একটি বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার এক সামাজিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের কেন্দ্রে থাকতে হবে জবাবদিহি, সুশাসন, কর ব্যবস্থার ন্যায়সংগত সংস্কার, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কারণ ইতিহাস বলে, উচ্চাভিলাষী বাজেট অনেক সরকারই ঘোষণা করেছে; কিন্তু সফল হয়েছে তারাই, যারা বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতিকে ফলাফলে রূপ দিতে পেরেছে।
আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো স্বপ্ন নয়, বরং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্য পথরেখা। বৃহত্তম বাজেটের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে একটিমাত্র প্রশ্নে-এটি কি মানুষের জীবনকে সত্যিই কিছুটা সহজ, নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় করতে পারবে?
সানা/আপ্র/১৪/৬/২০২৬