দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শুধু একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ খাতের তুলনায় বহুগুণ বেশি উদ্বেগের জন্ম দেয়। এমন বাস্তবতায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, কোটি কোটি টাকার প্রভাব ও লেনদেনের চেষ্টা সত্ত্বেও আদ্ দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এই সহজ-সরল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি দেশের স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, স্বাস্থ্যসেবার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রেও বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল কিংবা এখনো আছে। এ ধরনের বক্তব্য কোনোভাবেই সাধারণ ঘটনা নয়। বরং এটি এমন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে মানুষের জীবন ও চিকিৎসাসেবাকে ঘিরেও অবৈধ সুবিধা অর্জনের অপচেষ্টা চলে। সেই কারণে মন্ত্রীর এই অকপট স্বীকারোক্তি প্রশংসার দাবিদার। কারণ সমস্যাকে আড়াল না করে প্রকাশ্যে স্বীকার করাই সংস্কারের প্রথম শর্ত।
আদ্ দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পেছনে যে কারণগুলো সামনে এসেছে, বিশেষত নবজাতকের মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রেক্ষাপটে তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ, তা স্বাস্থ্যসেবার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যত বড় বা প্রভাবশালীই হোক না কেন, যদি তার কার্যক্রমে গুরুতর ত্রুটি, অবহেলা কিংবা নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে আইনের প্রয়োগ হতে হবে সমান ও নিরপেক্ষ। এ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারিত হয়।
তবে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-সরকার কি এটিকে একটি নীতিগত অবস্থানে রূপ দিতে পারবে? যদি সত্যিই কোটি কোটি টাকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে, তবে সেই মানসিকতা স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হতে হবে। লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, তদারকি, চিকিৎসার মান নিয়ন্ত্রণ, জনবল নিয়োগ এবং ক্রয়প্রক্রিয়াসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বাধীন ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা। কোনো দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক তদারকি জোরদার করতে হবে। রোগীর অধিকার, চিকিৎসা নিরাপত্তা এবং সেবার মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে তাই কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ঘোষিত অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। জনগণ এখন দেখতে চায়, এই বার্তা কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে কি না, নাকি বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে শুদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। কারণ মানুষের জীবন নিয়ে কোনো আপস নয়-এই নীতিই হতে হবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার চূড়ান্ত ভিত্তি।
সানা/আপ্র/১৫/৬/২০২৬