ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের দেড় মাসের মাথায় কলকাতার একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে।
পার্ক সার্কাসের সেভেন পয়েন্ট থেকে ডন বস্কো সার্কেল পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’র নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতা পুরসভা।
এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুরসভার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একে ইতিহাসের ‘গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম এমন একজন ব্যক্তির নামে ছিল, যিনি রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন। তার মতে, ইতিহাসের সেই ভুল সংশোধনের সময় এসেছে এবং পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রকৃত নায়কদের’ যথাযথ মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে যাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তিনি অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। ১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দাঙ্গা প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য ইতিহাসের বিভিন্ন ব্যাখ্যায় তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে তাকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তুলে ধরে আসছে।
অন্যদিকে নতুন নামকরণ হওয়া গোপালচন্দ্র মুখার্জি, যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে অধিক পরিচিত, ছিলেন পেশায় মাংস ব্যবসায়ী। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময় তিনি হিন্দু চরমপন্থি একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মুসলমানদের হত্যার অভিযোগও বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী মহলের একাংশ তাকে দাঙ্গার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, সেই অস্থির সময়ে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিলেন গোপালচন্দ্র মুখার্জি।
তবে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও বিধায়ক কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন, সড়কটির নাম আদৌ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে ছিল না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল প্রখ্যাত চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডক্টর স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে।
এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে কুণাল ঘোষ বলেন, ডক্টর হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, খ্যাতিমান চিকিৎসক এবং শিক্ষাবিদ। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বাংলার বিধান পরিষদের সদস্য হন। তিনি আরো উল্লেখ করেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন হাসান সোহরাওয়ার্দীর ভাইপো।
কুণাল ঘোষের মতে, যদি ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে একজন শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসকের স্মৃতিবাহী সড়কের নাম পরিবর্তন করা হয়ে থাকে, তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক হবে। তিনি বিষয়টি পুনরায় যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিতর্ক আরো গভীর হয়েছে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের ভিন্নমতের কারণে। কলকাতার ইতিহাস গবেষক গৌতম বসুমল্লিকের দাবি, ১৯৩৩ সালের ২০ এপ্রিল কলকাতা পুরসভার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সড়কটির নাম ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’ রাখা হয়েছিল। তার মতে, এটি ডক্টর হাসান সোহরাওয়ার্দীর স্মৃতিরক্ষার্থেই করা হয়েছিল।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক অমিত দেওও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, সড়কটির নাম অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে নয়; বরং শিক্ষাবিদ ও বহুভাষাবিদ ডক্টর হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে রাখা হয়েছিল। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য এবং উপমহাদেশের দ্বিতীয় মুসলিম ব্যক্তি, যিনি ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসের ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শিক্ষাক্ষেত্রের পাশাপাশি তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য এবং পরবর্তীতে ডেপুটি প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় তার বাসভবন দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে সেখানে বাংলাদেশ উপদূতাবাসের গ্রন্থাগার ও তথ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এ ব্যাখ্যাও সর্বজনস্বীকৃত নয়। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু উপাচার্যের মধ্যে কেন শুধু একজনের নামে রাস্তার নামকরণ করা হবে। তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্রে এ ধরনের কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাব তিনি খুঁজে পাননি।
বিতর্ককে আরো জটিল করে তুলেছে কলকাতা পুরসভার সাবেক কর্মকর্তা ও পথের নামকরণবিষয়ক গবেষক অজিতকুমার বসুর গবেষণা। তার প্রকাশিত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৩৩ সালের যে প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাস্তার নামকরণ হয়েছিল, সেখানে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর নাম রয়েছে। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং সোহরাওয়ার্দী পরিবারের অন্যতম খ্যাতিমান সদস্য।
ফলে সড়কটির নাম মূলত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ডক্টর হাসান সোহরাওয়ার্দী নাকি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর স্মরণে রাখা হয়েছিল—তা নিয়েই এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও নথিপত্রের ভিন্নতার কারণে কলকাতার এই নাম পরিবর্তন বিতর্ক ক্রমেই আরো জটিল আকার ধারণ করছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৩/৬/২০২৬