গাজীপুরের শ্রীপুরে অসুস্থ হয়ে পড়া এক পোশাকশ্রমিক ছুটি না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে কারখানায় কাজরত অবস্থায় মারা গেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
নিহত লিজা বেগম (২০) পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার হুগলাবুনিয়া গ্রামের আশরাফের মেয়ে। তিনি ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের কালার অ্যান্ড কোং কারখানায় কর্মরত ছিলেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কয়েক দিন আগে ১১ দিনের অসুস্থতাজনিত ছুটি শেষে কাজে যোগ দেন লিজা। বুধবার (২৪ জুন) রাতে দায়িত্ব পালনকালে রাত ৮টার দিকে তিনি অসুস্থ বোধ করেন এবং ছুটির জন্য সুপারভাইজার শাহ জালালের কাছে একাধিকবার আবেদন করেন। কিন্তু তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি। শ্রমিকদের দাবি, তিনি বারবার অনুরোধ করার পরও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে রাত পৌনে ১টার দিকে কারখানার ভেতরেই তার মৃত্যু হয়।
লিজার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল থেকে শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন এবং কারখানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘ সময় কাজ করানো হয় এবং অসুস্থ শ্রমিকদের প্রতিও প্রয়োজনীয় মানবিক আচরণ দেখানো হয় না। তাদের দাবি, লিজা অসুস্থ অবস্থায় বারবার ছুটি চাইলেও তা পাননি। এ ঘটনার জন্য তারা সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারের বিচার দাবি করেন।
এদিকে লিজার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আশপাশের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরে প্রায় দেড় থেকে দুইশ শ্রমিক মাওনা-শ্রীপুর আঞ্চলিক সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় তারা লিজার মৃত্যুর বিচার দাবি করেন।
পরে একদল বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি ভাংনাহাটি গ্রামের সিআরসি অ্যাপারেলস লিমিটেড, এমএইচসি অ্যাপারেলস লিমিটেড, কেওয়া গ্রামের ট্রিপল অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং মাওনা চৌরাস্তার নোমান উইভিং লিমিটেডসহ চারটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর মধ্যে ট্রিপল অ্যাপারেলসের প্রধান ফটক, অফিস কক্ষ ও বিভিন্ন ভবনের কাচ ভাঙচুর করা হয়। এমএইচসি অ্যাপারেলসে হামলা চালিয়ে প্রধান ফটক, ভবনের কাচ, আসবাবপত্র, একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও দুটি পণ্যবাহী যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। অন্য দুটি কারখানাতেও হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কালার অ্যান্ড কোং কারখানার পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, অসুস্থ হয়ে লিজা নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তার মরদেহ পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারখানায় এক দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং শ্রমিকের প্রাপ্য পাওনা যথাযথভাবে পরিশোধ করা হবে। কোনো কর্মকর্তার অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ভাঙচুরের শিকার কারখানাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, খবর পেয়ে কালার অ্যান্ড কোং কারখানার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। একই সময়ে একদল দুষ্কৃতকারী চারটি পৃথক কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে নোমান উইভিং লিমিটেডের সামনে থেকে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভূইঞা বলেন, কারখানাগুলোতে হামলার বিষয়টি জানা গেছে। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কোনো অপচেষ্টা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সানা/আপ্র/২৬/৬/২০২৬