গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মেনু

ঘুষের মহামারি ও রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:০০ পিএম, ২৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০০:০৭ এএম ২০২৬
ঘুষের মহামারি ও রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট
ছবি

প্রতীকী ছবি

একটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার প্রধান ভিত্তি হলো-সেবা পেতে তাকে আইন ও ন্যায্যতার ওপর নির্ভর করতে হবে, অর্থের বিনিময়ে নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক জরিপে দেশের সেবাখাতে ঘুষের যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল দুর্নীতির ব্যাপকতাই প্রকাশ করে না; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সুশাসনের গভীর সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতির দাবির পাশাপাশি যদি নাগরিককে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবার জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হতে হয়, তবে সেই উন্নয়নের ভিত্তি যে দুর্বল হয়ে পড়ে, এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। আগের জরিপের তুলনায় এই অঙ্ক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ভূমি, বিচার, আইনশৃঙ্খলা, পাসপোর্ট, কৃষি, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎসহ নাগরিক জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ঘুষের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রা লাভ করেছে। আরো হতাশার বিষয়, অধিকাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ সেবা পাওয়ার জন্য সরাসরি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ ঘুষ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম নয়; বরং সেবা পাওয়ার এক অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, দুর্নীতির বোঝা সমানভাবে সবাই বহন করে না। সমাজের দরিদ্র, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষই এর সবচেয়ে বড় শিকার। একটি জমির নথি, একটি পাসপোর্ট, একটি চিকিৎসাসেবা কিংবা ন্যায়বিচার পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে তাদের সীমিত আয় আরো সংকুচিত হয়। ফলে ঘুষ কেবল অবৈধ অর্থ লেনদেন নয়; এটি বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় করে।

এখানে ইতিহাসের একটি তিক্ত বাস্তবতার কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিষয়ক সূচকে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ছিল। সে সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। সেই অধ্যায় জাতির জন্য ছিল গভীর লজ্জা ও আত্মসমালোচনার বিষয়। বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকায় অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় তাদের ওপর আরো বেশি বর্তায়। আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে কঠোর, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে অতীতের সেই কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসার সর্বোত্তম পথ।

তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো একক সরকারের একক দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, সেবাপ্রদান প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমান আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগকারীর নিরাপত্তা ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থাও ফিরবে না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তার প্রতিফলন ঘটতে হবে বাস্তব কর্মকাণ্ডে। কারণ ঘুষের বিস্তার শুধু অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে এবং উন্নয়নের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ঘুষের এই মহামারি রোধে আজ যে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
সানা/আপ্র/২৯/৬/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

দূরদর্শী কূটনীতির নবদিগন্তে বাংলাদেশ, জাতীয় স্বার্থেই চাই বিচক্ষণ ভারসাম্য
২৭ জুন ২০২৬

দূরদর্শী কূটনীতির নবদিগন্তে বাংলাদেশ, জাতীয় স্বার্থেই চাই বিচক্ষণ ভারসাম্য

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক...

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়
২৬ জুন ২০২৬

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল, জনসমাবেশের ভিড় কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে...

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?
২৩ জুন ২০২৬

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?

একটি রাষ্ট্রের করব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়, সাম্য ও সক্ষমতাভিত্তিক অবদান। যে নাগরিকের আয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট বিতর্ক ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট আবেদনটি ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত ও হেয় প্রতিপন্ন করার একটি প্রচেষ্টা। আপনি কি মনে করেন চিফ প্রসিকিউটরের মন্তব্য সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 23 ঘন্টা আগে