একটি গোল যেন কখনো কখনো পুরো ম্যাচের গল্প বদলে দেয়। আবার একটি জয় হয়ে ওঠে চরিত্র, ধৈর্য ও বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। হিউস্টনের মাঠে জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয় ছিল ঠিক তেমনই—প্রতিপক্ষের দুর্ভেদ্য রক্ষণ, পিছিয়ে পড়ার হতাশা আর সময়ের নির্মম চাপকে উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত জয়ের হাসি। নাটকীয় এই লড়াইয়ে ২-১ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।
প্রথমার্ধে মাঠে আধিপত্য ছিল ব্রাজিলের, কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল জাপানের পরিকল্পনায়। বলের দখল, আক্রমণের পর আক্রমণ, প্রতিপক্ষের অর্ধে দীর্ঘ সময় অবস্থান—সবই ছিল সেলেসাওদের। অথচ গোলের সামনে পৌঁছেই যেন হারিয়ে যাচ্ছিল ছন্দ। ভিনিসিউস জুনিয়র, মাতেউস কুইয়া কিংবা কাসেমিরো—কেউই জাপানের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণে ফাটল ধরাতে পারছিলেন না।
অন্যদিকে জাপান খেলেছে নিখুঁত কৌশলে। নিজেদের অর্ধে গড়ে তোলে প্রায় দুর্ভেদ্য এক প্রতিরক্ষা-বলয়, সুযোগ পেলেই ছুটে গেছে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে। সেই পরিকল্পনারই পুরস্কার আসে ২৯তম মিনিটে। মাঝমাঠে ব্রাজিলের ভুল পাস কাড়ার পর কাইশু সানো দুরন্ত গতিতে এগিয়ে গিয়ে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দৃষ্টিনন্দন শটে পরাস্ত করেন আলিসনকে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে জাতীয় দলের হয়ে নিজের প্রথম গোলেই জাপানকে এগিয়ে দেন তিনি।
ব্রাজিলকে সমতায় ফেরানোর পর নেইমারের সঙ্গে কাসেমিরোর (বাঁয়ে) উদযাপন -ছবি রয়টার্স
গোল হজমের পরও প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে যেন চিনতেই কষ্ট হচ্ছিল। বল ছিল তাদের পায়ে, কিন্তু আক্রমণে ছিল না ধার, ছিল না সৃজনশীলতার সেই চেনা ঝলক। জাপানের রক্ষণ ছিল এতটাই সংগঠিত যে প্রতিটি আক্রমণই গিয়ে থেমেছে নীল জার্সির দেয়ালে।
বিরতির বাঁশি যেন বদলে দেয় ম্যাচের আবহ। কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তনের পর আরও দ্রুত, আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে ব্রাজিল। লুকাস পাকেতার জায়গায় এন্দ্রিককে নামানোর পর আক্রমণে আসে নতুন গতি, নতুন তীব্রতা।
৫৫তম মিনিটেই সমতার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কাসেমিরোর হেড গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন জাপানি ডিফেন্ডাররা। কিন্তু সেই প্রতিরোধ স্থায়ী হয়নি। পরের মিনিটেই ভিনিসিউস জুনিয়রের সূক্ষ্ম কাটব্যাক থেকে গাব্রিয়েল মাগালাইসের নিখুঁত ক্রস উড়ে আসে কাসেমিরোর সামনে। অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারের শক্তিশালী হেডে জালে বল জড়াতেই প্রাণ ফিরে পায় ব্রাজিল।
সমতায় ফেরার পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়। আক্রমণের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়তে থাকে জাপানের রক্ষণে। ৬০তম মিনিটে ভিনিসিউস জুনিয়রের অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে নেওয়া শট গোলরক্ষক সুজুকির আঙুল ছুঁয়ে পোস্টে লেগে ফিরে না এলে ব্রাজিল আরও আগেই এগিয়ে যেতে পারত।
সময়ের কাঁটা যত এগিয়েছে, জাপানের প্রতিরোধও তত দৃঢ় হয়েছে। মনে হচ্ছিল, ম্যাচ বুঝি অতিরিক্ত সময়ের দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু বড় দলের সবচেয়ে বড় পরিচয়ই হলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা।
যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে সেই বিশ্বাসই জয়ের রূপ নেয়। ডান দিকের আক্রমণে কয়েকজনের পায়ে বল ঘুরে ব্রুনো গিমারেসের নিখুঁত পাস পৌঁছে যায় গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির কাছে। দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে কোনাকুনি শটে জাপানের স্বপ্ন ভেঙে দেন আর্সেনাল ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করে তিনি নিশ্চিত করেন ব্রাজিলের নকআউট পর্বে অগ্রযাত্রা।
কাসেমিরোর গোলে ব্রাজিল সমতায় -রয়টার্স
পরিসংখ্যানও বলছে, জয়টি ছিল ব্রাজিলের প্রাপ্য। ৬৫ শতাংশের বেশি সময় বলের নিয়ন্ত্রণ রেখে ১৯টি শট নেয় সেলেসাওরা, যার সাতটি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে জাপান পাঁচটি শটের দুটি লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয়। তবে সংখ্যার চেয়ে বড় ছিল জাপানের লড়াইয়ের মানসিকতা, যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্রাজিলকে কঠিন পরীক্ষায় রেখেছিল।
এই জয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। পরবর্তী পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আইভরি কোস্ট অথবা নরওয়ে। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আরেকবার অপূর্ণ রয়ে গেল জাপানের স্বপ্ন। আগের চারবারের মতো এবারও নকআউটের প্রথম বাধাই পেরোনো হলো না তাদের।
তবে পরাজয়ের পরও জাপান রেখে গেল সাহস, শৃঙ্খলা ও লড়াকু মানসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর ব্রাজিল প্রমাণ করল, বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ বাঁশি বাজার আগে তাদের হারিয়ে দেওয়ার গল্প লেখা কখনোই সহজ নয়।
সানা/আপ্র/৩০/৬/২০২৬