গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

মেনু

দূরদর্শী কূটনীতির নবদিগন্তে বাংলাদেশ, জাতীয় স্বার্থেই চাই বিচক্ষণ ভারসাম্য

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৮:২০ পিএম, ২৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২০:২৫ এএম ২০২৬
দূরদর্শী কূটনীতির নবদিগন্তে বাংলাদেশ, জাতীয় স্বার্থেই চাই বিচক্ষণ ভারসাম্য
ছবি

ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই সফরে বিপুল অঙ্কের ঋণ বা বিনিয়োগ ঘোষণার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুই দেশের সম্পর্ককে একটি সুসংহত, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠার অভিন্ন অঙ্গীকার। যৌথ ঘোষণাপত্র, একাধিক সমঝোতা স্মারক, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সহযোগিতা, কৌশলগত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের উদ্যেঠস-সব মিলিয়ে এই সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠার সুযোগও এনে দিতে পারে। বিশেষ করে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ চালুর উদ্যোগ ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে আরো প্রাতিষ্ঠানিক ও ধারাবাহিক রূপ দেবে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাবও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বন্দর, সড়ক, রেল ও শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকারের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে রাখাইন অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাই হতে হবে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সহযোগিতার অঙ্গীকারও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পানি-সংকটের প্রেক্ষাপটে নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং পানি সম্পদের টেকসই ব্যবহারে কার্যকর সহযোগিতা দেশের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে। তবে যেকোনো বৃহৎ প্রকল্পের মতো এখানেও স্বচ্ছতা, দক্ষতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে সাফল্যের মূল শর্ত।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি-‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’-আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে অস্বস্তি ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়েও নানামুখী আলোচনা, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন চলছে। এমন বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা অবশ্যই ইতিবাচক; তবে সেই সম্ভাবনা যেন কোনোভাবেই অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য ক্ষুণ্ন না করে, সেদিকে সমান সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির শক্তি কখনোই কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতায় নয়; বরং বহুমাত্রিক ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতায়। অতীতে কোনো একটি দেশের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁকের ধারণা যেমন দেশে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, তেমনি বর্তমান বা ভবিষ্যতেও অন্য কোনো শক্তিকে ঘিরে একই ধরনের ধারণা সৃষ্টি হওয়া সমানভাবে অনাকাঙিক্ষত। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক আজও বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে আবদ্ধ। ফলে বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক উদ্যোগ কেবল দ্বিপক্ষীয় লাভ-লোকসানের বিচারে নয়; বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়েই গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের মতো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পে অগ্রসর হওয়ার আগে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা, সার্বভৌম স্বার্থ, ঋণঝুঁকি, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করা অপরিহার্য।

তবে কূটনীতির প্রকৃত মূল্যায়ন কখনোই ঘোষণাপত্র বা সমঝোতা স্মারকের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না; তার সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বহু সম্ভাবনাময় উদ্যোগ নানা কারণে কাঙিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। তাই এবার প্রয়োজন সুসমন্বিত পরিকল্পনা, নির্ধারিত সময়সূচি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ দক্ষতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও অপরিহার্য।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দূরদর্শী কূটনীতি, অর্থনৈতিক বাস্তববাদ এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতাই ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণ করবে। চীন সফর নিঃসন্দেহে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। কিন্তু সম্ভাবনা তখনই সাফল্যে রূপ নেবে, যখন প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে সুপরিকল্পিত, স্বচ্ছ এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক। পররাষ্ট্রনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই; স্থায়ী হয় কেবল রাষ্ট্রের স্বার্থ। সেই চিরন্তন বাস্তবতাকে ধারণ করেই বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে-কারও প্রভাববলয়ে নয়, বরং নিজের স্বার্থ, মর্যাদা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।
সানা/আপ্র/২৭/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়
২৬ জুন ২০২৬

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল, জনসমাবেশের ভিড় কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে...

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?
২৩ জুন ২০২৬

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?

একটি রাষ্ট্রের করব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়, সাম্য ও সক্ষমতাভিত্তিক অবদান। যে নাগরিকের আয়...

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ
২২ জুন ২০২৬

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ

প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

২০২৫ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আপনি কি মনে করেন এই জরিপ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে