দেশের অন্যতম প্রধান মেরিটাইম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে তীব্র শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। বারবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে অভিজ্ঞ শিক্ষকেরাও একে একে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাচ্ছেন। এতে ক্যাডেটদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি একাডেমির শিক্ষার মান এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষক সংকটের প্রধান কারণ বেতনবৈষম্য। সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজে একজন মাস্টার মেরিনার বা চিফ ইঞ্জিনিয়ারের মাসিক আয় ১৫ লাখ টাকার বেশি হতে পারে। বিপরীতে মেরিন একাডেমিতে শিক্ষকতা করলে সরকারি বেতন কাঠামোয় মাসে এক লাখ টাকারও কম বেতন পাওয়া যায়। ফলে উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মেরিন পেশাজীবীদের একাডেমিতে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির জনবল কাঠামোয় প্রফেশনাল শিক্ষক পদ রয়েছে ২০টি। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র অর্ধেক। শূন্য পদ পূরণে একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও পর্যাপ্ত সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ ২০২৩ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও আশানুরূপ প্রার্থী পাওয়া যায়নি। বর্তমানে অল্প কয়েকজন শিক্ষকের ওপরই অধিকাংশ ক্লাস ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে এ একাডেমির শিক্ষক হওয়া যায় না। এখানে পড়াতে হলে মাস্টার মেরিনার বা চিফ ইঞ্জিনিয়ারের মতো পেশাগত সনদ এবং সমুদ্রগামী জাহাজে কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এসব যোগ্যতাসম্পন্ন মেরিনারদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তারা ডলারে বেতন পান। ফলে সরকারি বেতন কাঠামোয় তুলনামূলক কম পারিশ্রমিকে দেশে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার (আইএমও) বাধ্যবাধকতা এবং দেশীয় আইন অনুযায়ী, মেরিন ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দক্ষ ও সনদপ্রাপ্ত মেরিন পেশাজীবীদের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হয়। আইএমও নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিরীক্ষা করে। ফলে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক না থাকলে প্রশিক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি একাডেমির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মেরিন একাডেমি অ্যালামনাই সদস্যদের আশঙ্কা, সামনে আইএমওর নিরীক্ষক দল আসার আগে শিক্ষক সংকটের সমাধান না হলে বাংলাদেশকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। এ সংকট মোকাবিলায় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র ও বিশেষ বেতন কাঠামো চালুর পরামর্শ দিয়েছেন মেরিন পেশাজীবীরা।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, একজন মেরিন ক্যাডেটের প্রশিক্ষণের পেছনে সরকার তিন বছরে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। অথচ চাকরিতে যোগ দেওয়ার শুরুতেই তাদের মাসিক বেতন পাঁচ লাখ টাকার বেশি হয়। তার আশঙ্কা, দ্রুত শিক্ষক সংকটের সমাধান না হলে চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। এতে শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার ‘হোয়াইটলিস্ট’ বা বৈশ্বিক স্বীকৃতি থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, ২০১২ সালে ফিলিপাইনও এ ধরনের সংকটে পড়েছিল। পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দেশটির নয় বছর সময় লেগেছিল। কোনো প্রতিষ্ঠান বা দেশ হোয়াইটলিস্ট থেকে বাদ পড়লে সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ক্যাডেটদের বিদেশি জাহাজে চাকরির সুযোগ থাকবে না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
শিক্ষক নিয়োগে বেতনবৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন মাস্টার মেরিনার বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজে চাকরি করে মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার ডলার, অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারেন। অথচ মেরিন একাডেমিতে যোগ দিলে সরকারি বেতন কাঠামোয় তার বেতন এক লাখ টাকারও কম। এ ব্যবধানের কারণে অভিজ্ঞ মেরিনাররা সমুদ্রগামী জাহাজের চাকরি ছেড়ে একাডেমিতে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম বলেন, ইনস্ট্রাকটর নিয়োগের একাধিক বোর্ডে তিনি দেখেছেন, চারটি পদের বিপরীতে মাত্র একজন প্রার্থী সাক্ষাৎকার দিতে এসেছেন। ওই একমাত্র প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করা হলেও বেতন কাঠামো বাড়ার সম্ভাবনা না থাকায় তিনি যোগ দেননি।
ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীমের ভাষ্য, এভাবে চলতে থাকলে একাডেমির আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখা কঠিন হবে। শিক্ষক সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে এর ঝুঁকি বহন করতে হবে।
প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের পরামর্শ: ২০টি পদের বিপরীতে অর্ধেক শিক্ষক কর্মরত থাকার তথ্য, ২০২৩ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ফল, বেতন কাঠামো এবং ২০১২ সালে ফিলিপাইনের হোয়াইটলিস্ট-সংক্রান্ত ঘটনার তথ্য সংশ্লিষ্ট নথি বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দিয়ে নিশ্চিত করা ভালো। বিশেষ করে হোয়াইটলিস্ট থেকে বাদ পড়লে ক্যাডেটদের বিদেশি জাহাজে চাকরির সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে - এ দাবিটি আইএমওর বিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৭/১১/২০২৬