গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

৫ আগস্ট ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস

গণজোয়ারে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পতন, বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের সূচনা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০১:৪১ পিএম, ০৫ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০০:১৪ এএম ২০২৬
গণজোয়ারে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পতন, বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের সূচনা
ছবি

২০২৪ সালের জুনে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে, তা দ্রুত রূপ নেয় বৃহত্তর গণআন্দোলনে -ফাইল ছবি

একটি দাবির আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া গণজোয়ার শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রের ইতিহাস বদলে দেওয়া এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে। রক্ত, অশ্রু ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনের। ওই দিন শুধু একটি সরকারের বিদায় ঘটেনি, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সূচিত হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়ের। ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস নিয়ে লিখেছেন -সুখদেব কুমার সানা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক অভূতপূর্ব বাঁকবদলের দিন। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের ছাত্র আন্দোলন, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ও প্রবল গণপ্রতিরোধের মুখে ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে টানা প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশের রাজনীতিতে সূচিত হয় নতুন এক অধ্যায়।

যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে, তা দ্রুত রূপ নেয় বৃহত্তর গণআন্দোলনে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে। একপর্যায়ে এটি পরিণত হয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশে।

কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান: ২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের বিষয়ে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়। তারা মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন শুরু করেন। শুরুতে এটি ছিল শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক কর্মসূচি। কিন্তু আন্দোলন দমনে সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের অভিযোগের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গ্রেফতার ও নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসে। পরিস্থিতি যত উত্তপ্ত হয়, আন্দোলনের দাবিও ততো বিস্তৃত হতে থাকে। একপর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এরপর ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

পাঁচ আগস্টের উত্তাল সকাল: ৫ আগস্ট ভোর থেকেই রাজধানীমুখী হতে শুরু করেন হাজার হাজার মানুষ। কারফিউ, বাধা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ঢাকার দিকে এগিয়ে আসেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে মানুষের ঢল নামে। দুপুরের পর পরিস্থিতি একেবারেই পাল্টে যায়। সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিজয় মিছিল শুরু হয়।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ ত্যাগ করেন। তিনি ভারতে চলে যান; সেখানেই অবস্থান নেন।

সেদিন গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ এলাকায় আন্দোলনকারী জনতাসহ বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ প্রবেশ করেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙক্ষার প্রতীক হিসেবে এসব দৃশ্য বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তন: চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ছিল প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও তদন্ত প্রতিবেদনে এ সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের নিহত ও আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

আন্দোলনে অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। বহু পরিবার হারিয়েছে তাদের স্বজন। নিহত ও আহতদের পরিবারগুলো এখনো সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে।

আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে। একাধিক মামলার রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ও এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ: বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে শুধু তাৎক্ষণিক কোনো ইস্যু নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ কাজ করেছে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তবে এই সময় নির্বাচন ব্যবস্থা, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা আলোচনা ও সমালোচনা হয়।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দলের বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও বিরোধী দলগুলো অনিয়মের অভিযোগ তোলে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

এ ছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। সাথে ছিল ব্যাংক লুটপাট ও বগ্লাহীন দুর্নীতি, বাজার ব্যবস্থা ধ্বংসের মতো জনস্বার্থবিরোধী দুঃশাসন। এসব বিষয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।

নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা: চব্বিশের পাঁচ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়েও বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের নিশ্চয়তা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন পরিবর্তনের আকাঙক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। মানুষের ভোটাধিকার, আইনের শাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলেই এই পরিবর্তন অর্থবহ হবে।

চব্বিশের পাঁচ আগস্ট তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একই সঙ্গে বিজয়, বেদনা ও দায়িত্বের দিন। রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে অর্জিত এই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারণে কতটা সফল হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সানা/আপ্র/৫/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

গার্ড অব অনার নিয়ে উত্তেজনা, গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন
২৫ অক্টোবর ২০২৬

গার্ড অব অনার নিয়ে উত্তেজনা, গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন

সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য

বিয়ের দিন বরের জানাজা, শোকে স্তব্ধ দুই পরিবার
১৬ অক্টোবর ২০২৬

বিয়ের দিন বরের জানাজা, শোকে স্তব্ধ দুই পরিবার

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১২২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম
১৬ অক্টোবর ২০২৬

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১২২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম

শিশুদের তীব্র অপুষ্টি বেড়েছে, আট বছরে ক্ষুধা কমেছে মাত্র ৪ শতাংশ

পীরগঞ্জে পৌর ভবনের ছাদ ধসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু, দায় কার?
১৪ অক্টোবর ২০২৬

পীরগঞ্জে পৌর ভবনের ছাদ ধসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু, দায় কার?

তদন্ত কমিটি গঠন; মামলায় আসামি ৯

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে