মাতৃভাব মানবহৃদয়ের অন্যতম পবিত্র অনুভূতি। এই ভাবের মধ্যেই নিহিত রয়েছে স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা ও শুদ্ধতার এক অনন্য প্রকাশ। সনাতন ধর্মে নারীকে কেবল মানবী হিসেবে নয়, শক্তি ও সৃষ্টির আধার হিসেবেও কল্পনা করা হয়েছে। ওই দর্শনেরই এক মহিমান্বিত প্রকাশ কুমারীপূজা। একটি নিষ্পাপ কন্যার মধ্যে দেবীশক্তির উপস্থিতি অনুভব করা এবং তাকে জগন্মাতার প্রতিরূপ হিসেবে শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদন করাই এই পূজার মূল তাৎপর্য। শ্রী রামকৃষ্ণ বলতেন, মাতৃভাব বড় শুদ্ধভাব। কুমারীর মধ্যে দৈবীভাবের প্রকাশ দেখা কিংবা তাকে জননীরূপে পূজা করা সেই শুদ্ধসত্ত্ব ভাবেরই সার্থক প্রকাশ। তাই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কুমারীপূজা নিছক একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং মাতৃশক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, নারীসত্তার পবিত্রতা এবং সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তিকে উপলব্ধি করার এক অনন্য সাধনা।
সনাতন ধর্মের প্রাচীন তত্ত্ব, বেদ, পুরাণ, তন্ত্র ও বিভিন্ন দার্শনিক শাস্ত্রে দেবদেবীর উপাসনা এবং শক্তিসাধনার যে বহুমাত্রিক ধারা বিকশিত হয়েছে, দুর্গাপূজার মধ্যে তার এক অসাধারণ সমন্বয় ঘটেছে। এই সমন্বিত উপাসনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কুমারীপূজা, যা ভক্তের সামনে এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দ্বার উন্মোচন করে। কুমারীকে মনে করা হয় দেবীশক্তির নির্মল আধার। দুর্গাপূজা ছাড়াও কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা, অন্নপূর্ণাপূজা এবং কামাখ্যার মতো শক্তিক্ষেত্রে কুমারীপূজার প্রচলন রয়েছে। এসব উপাসনায় কুমারীকে দেবী ভগবতীর সাত্ত্বিক রূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়। জগন্মাতা সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্ত্রী হয়েও চিরকুমারী, এই ধর্মীয় ভাবনার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে শক্তির অনাদি, অনন্ত ও স্বয়ম্ভূ স্বরূপ। এ কারণেই বিভিন্ন শক্তিপীঠে কুমারীপূজার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে এই উপাসনার প্রচলনের সাক্ষ্য মেলে কুমারীপূজাসংক্রান্ত বিভিন্ন শাস্ত্রীয় গ্রন্থ ও পুঁথিতে।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর পূজা শেষে কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে মতান্তরে নবমী তিথিতেও এই পূজা হতে পারে। একসময় দুর্গাপূজার সঙ্গে কুমারীপূজার প্রচলন থাকলেও পরবর্তী সময়ে অনেক স্থানে এর চর্চা সীমিত হয়ে পড়ে। উনিশ শতকের শেষভাগে স্বামী বিবেকানন্দ এই প্রাচীন সাধনাকে নতুনভাবে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে আসেন।
তন্ত্রশাস্ত্রের বিধান অনুসারে, সাধারণত ষোলো বছরের অনধিক এবং ঋতুমতী নয়, এমন কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। ‘যোগিনীতন্ত্র’, ‘কুলার্ণবতন্ত্র’, ‘দেবীপুরাণ’, ‘তন্ত্রসার’, ‘প্রাণতোষিণী’ ও ‘পুরোহিতদর্পণ’সহ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে কুমারীপূজার পদ্ধতি ও মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। শাস্ত্রীয় আদর্শে কুমারীর উপাসনায় জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ থাকার কথা নয়; দেবীজ্ঞানে যেকোনো কুমারীই পূজনীয়। তবে প্রচলিত সামাজিক রীতিতে অনেক স্থানে ব্রাহ্মণকন্যাকে পূজা করার প্রাধান্য দেখা যায়। বয়সের ভিত্তিতে এক থেকে ষোলো বছর বয়সী কন্যাদের বিভিন্ন দেবীসুলভ নামে অভিহিত করার বিধানও রয়েছে। যথাক্রমে এক বছরের কন্যা সন্ধ্যা, দুই বছরের সরস্বতী, তিন বছরের ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কালিকা, পাঁচ বছরের সুভাগা, ছয় বছরের উমা, সাত বছরের মালিনী, আট বছরের কুব্জিকা, নয় বছরের কালসন্দর্ভা, দশ বছরের অপরাজিতা, এগারো বছরের রুদ্রাণী, বারো বছরের ভৈরবী, তেরো বছরের মহালক্ষ্মী, চৌদ্দ বছরের পীঠনায়িকা, পনেরো বছরের ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরের কন্যা অন্নদা বা অম্বিকা নামে পরিচিত। বিভিন্ন শাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রথায় এসব নামের কিছু পার্থক্যও দেখা যায়। নামের এই বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে কুমারীর মধ্যে দেবীশক্তির বহুরূপী প্রকাশকে উপলব্ধি করার প্রয়াস প্রতিফলিত হয়েছে।
কুমারীপূজার প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিকতায় রয়েছে পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও ভক্তির নিবিড় সমন্বয়। পূজার দিন সকালে নির্বাচিত কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরানো হয়। ফুলের গয়না ও নানা অলংকারে সাজিয়ে তার পা ধুয়ে আলতা পরানো হয়, কপালে দেওয়া হয় সিঁদুরের তিলক এবং হাতে তুলে দেওয়া হয় ফুল। এরপর পূজামণ্ডপে সুসজ্জিত আসনে তাকে বসানো হয়। সামনে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও অন্যান্য পূজার উপকরণ। যথাবিধি ধ্যান, মন্ত্রোচ্চারণ ও উপাচারের মাধ্যমে তার মধ্যে দেবীর উপস্থিতি কল্পনা করে পূজা নিবেদন করা হয়। ভক্তের বিশ্বাসে, প্রতিমার মধ্যে দেবীর আরাধনা যেমন পবিত্র, তেমনি জীবন্ত কুমারীর মধ্যে দেবীভাব উপলব্ধি করে পূজা নিবেদনের রয়েছে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। কুমারীকে ফুল দিয়ে পূজা করা, তাকে ভোজন করানো এবং সম্মানের সঙ্গে আপ্যায়ন করাকেও শাস্ত্রে বিশেষ পুণ্যকর্ম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দেবীপুরাণের বিধান অনুসারে, দেবীপূজার পর উপযুক্ত উপাচারে কুমারীদের ভোজন করানোর মধ্য দিয়ে পূজার পরিপূর্ণতা ও জগতের কল্যাণ কামনা করা হয়। যাগযজ্ঞ ও হোমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কুমারীপূজার মাহাত্ম্যও নানা শাস্ত্রীয় বর্ণনায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
কুমারীপূজার অন্তর্নিহিত দর্শন কেবল আচারসর্বস্ব নয়; এর গভীরে রয়েছে প্রকৃতি, নারীসত্তা ও সৃষ্টিশক্তির এক সমন্বিত উপলব্ধি। সনাতন দর্শনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের পেছনে যে ত্রিবিধ শক্তির কার্যকারিতা কল্পনা করা হয়েছে, কুমারীর মধ্যে সেই শক্তির বীজরূপ নিহিত বলে মনে করা হয়। কুমারী তাই প্রকৃতির প্রতীক, নারীজাতির প্রতীক এবং সম্ভাবনাময় সৃষ্টির আদি অবস্থার প্রতীক। তার মধ্যে দেবীভাব আরোপ করে পূজা করার অর্থ হলো সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং জীবনের পবিত্রতাকে উপলব্ধি করা। আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির দীর্ঘ ঐতিহ্যের নানা ধারায় শিবজায়া দুর্গার কুমারীরূপের উপাসনার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা এই সাধনার প্রাচীনত্ব ও সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তির ইঙ্গিত বহন করে। কুমারীপূজার প্রকৃত মাহাত্ম্য তাই কেবল মন্ত্র, ফুল, ধূপ কিংবা নৈবেদ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল শিক্ষা হলো নারীকে শক্তির আধার হিসেবে মর্যাদা দেওয়া, নিষ্পাপ শিশুর প্রতি স্নেহ ও সম্মান প্রদর্শন করা এবং জীবনের প্রতিটি সৃষ্টিশীল প্রকাশের মধ্যে ঐশ্বরিক সম্ভাবনা অনুভব করা।
কেএমএএ/আপ্র/২১.১০.২০২৬