মাহফুজ আলম সোহাগ, জাবি প্রতিনিধি: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সৈকত হালদারকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে আয়োজিত এ কর্মসূচি থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সৈকতকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে এবং অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।
রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। পরে শহীদ রফিক-জব্বার চত্বর, জেনারেটর বাজার, সালাম-বরকত হল, কামালউদ্দিন হল ও মুরাদ চত্বর প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং প্রশাসনের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
মিছিল চলাকালে শিক্ষার্থীরা ‘বিশ্বনবীর অপমান, সইবে না-রে মুসলমান’, ‘আমাদের নেতা কে, বিশ্বনবী মোস্তফা’, ‘ইসলাম বিদ্বেষীর ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’ এবং ‘প্রহসনের বিচার, মানি না মানব না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
সাময়িক বহিষ্কার ও তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি অফিস আদেশে জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ-২০১৮-এর ৪(১)(খ) ধারা অনুযায়ী সৈকতকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তে একই অধ্যাদেশের ৪(১)(ক) ধারা অনুযায়ী চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি করা হয়েছে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা নাজমুল মানছুরকে। সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার (সাধারণ প্রশাসন) মো. মাহতাব-উজ-জাহিদ। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ-জেইউ) অধ্যাপক ড. কে এম জাহিদুল ইসলাম এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের ওয়ার্ডেন ড. মো. আলমগীর কবির। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোগটি দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২৯৫(ক) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ীও অভিযোগটি তদন্ত করা হবে।
বিক্ষোভ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রথম দাবি, আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে যথাযথ তদন্ত শেষ করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সৈকতকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাদী হয়ে প্রচলিত আইনে মামলা করতে হবে। দ্বিতীয় দাবিতে একই বিভাগের শিক্ষার্থী বন্ধন কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ পুনঃতদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তৃতীয় দাবিতে হিম উৎসব-২০২৬-এ ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে উৎসবের আয়োজকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়। চতুর্থ দাবিতে ধর্মীয় অবমাননামূলক ঘটনা প্রতিরোধে স্থায়ী বহিষ্কারের বিধান রেখে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান শিক্ষার্থীরা।
সমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক রাশিদুল ইসলাম লিখন বলেন, অভিযোগটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে দায় প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা ও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামসুল আলম দাবিগুলোকে ন্যায্য ও যৌক্তিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, প্রশাসন দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। বিবৃতিতে বলা হয়, ন্যায়বিচারের দাবি যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি কিংবা সহিংসতার রূপ না নেয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানান তাঁরা।
সানা/আপ্র/১৪/১০/২০২৬