একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম: ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে প্রতারক চক্রের হাতে। আবেদনকারীর নাম, মোবাইল ফোন নম্বর ও আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা জেনে তাকে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া খুদে বার্তা। এরপর নাম সংশোধনের কথা বলে মাত্র ৯ টাকা ফি চাওয়া হচ্ছে। প্রতারকদের তৈরি নকল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্য দিলেই মুহূর্তে হিসাবের সব টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।
চট্টগ্রামে একাধিক ই-পাসপোর্ট আবেদনকারী এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে প্রতারকদের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে ই-পাসপোর্টের সার্ভার ও তথ্য সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টিকে নাগরিকদের জন্য বিপজ্জনক ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, কারিগরি কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে ই-পাসপোর্টের আবেদন করেন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সহকারী অধ্যাপক আফরোজা সুলতানা। আবেদন জমা দেওয়ার পর তার মোবাইল ফোনে একই ধরনের একটি প্রতারণামূলক খুদে বার্তা আসে। বার্তায় দেওয়া লিংকে প্রবেশ করলে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী নাম ও মোবাইল নম্বর দিতে বলা হয়। এরপর নাম সংশোধনের জন্য ৯ টাকা পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তিনি বিকাশ নম্বর দেওয়ার পর এককালীন পাসওয়ার্ড ও ব্যক্তিগত পরিচিতি নম্বর দিলে তার হিসাবে থাকা সব টাকা কেটে নেওয়া হয়। একই দিন ওই পাসপোর্ট কার্যালয়ে আবেদন জমা দিয়ে একই ধরনের প্রতারণামূলক বার্তা পান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। এর আগের দিন ১৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে নিজের ও সন্তানের পাসপোর্টের আবেদন করেন কলেজশিক্ষক ফারজানা আক্তার। নিজের আবেদনে তিনি নিজের মোবাইল নম্বর এবং সন্তানের আবেদনে স্বামীর নম্বর ব্যবহার করেন। পরে দুই নম্বরেই একই ধরনের বার্তা আসে। তবে স্বামীর সতর্কতার কারণে তারা প্রতারণার ফাঁদে পা দেননি।
ডিজিটাল অধিকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটালি রাইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে প্রতারকদের হাতে চলে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের উচিত, তথ্য কোন পর্যায় থেকে ফাঁস হচ্ছে, তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করাও জরুরি।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. নূরুল হাফিজ বলেন, কিছুদিন আগে একজন তাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তবে পরে ওই ব্যক্তি আর যোগাযোগ করেননি। এ ধরনের প্রতারণা থেকে নাগরিকদের সতর্ক করতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বিশেষ সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। এরপরও কারিগরি কমিটির সঙ্গে বসে বিষয়টি শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার দাবি, অধিদপ্তরের সুরক্ষিত সার্ভার থেকে এ ধরনের তথ্য যাওয়ার কথা নয়।
যেভাবে ফাঁদে ফেলছে প্রতারকরা: সূত্র জানায়, পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদনকারীদের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট নম্বর থেকে খুদে বার্তা পাঠানো হচ্ছে। নম্বরগুলো হলো- ০৯৬১২-৩৪৩১৭৬, ০৯৬৪৮-৯০২৬২৯ ও ০৯৬৪৮-৯০২৬৪০। ইংরেজিতে লেখা এসব বার্তায় দাবি করা হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে নামের অমিল থাকায় পাসপোর্টের আবেদন আটকে আছে। নাম সংশোধনের জন্য বার্তার সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত সংযোগসূত্রও দেওয়া হয়।
ওই সংযোগসূত্রে প্রবেশ করলে আবেদনকারীর সামনে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মূল ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি একটি নকল ওয়েবসাইট হাজির হয়। প্রতারকরা সরকারি ওয়েবসাইটের মনোগ্রাম, রং, নকশা, বিন্যাস, এমনকি নিচের অংশের লেখা ও স্বত্ব সংরক্ষণের ঘোষণাও নিখুঁতভাবে নকল করেছে। সেখানে নাম সংশোধনের জন্য আলাদা একটি পৃষ্ঠাও তৈরি করে রাখা হয়েছে।
ওই ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশের পর প্রথমেই আবেদনকারীর নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর চাওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, নাম সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়া বিনামূল্যে সম্পন্ন করা যাবে। তবে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য মাত্র ৯ টাকা দিতে হবে। সামান্য এই অর্থের প্রলোভন দেখিয়েই আবেদনকারীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
এরপর বিকাশ কিংবা অন্য মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের নম্বর ও গোপন পরিচিতি নম্বর দিতে বলা হয়। আবেদনকারী এসব তথ্য দেওয়ার পর প্রতারকরা তার হিসাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। একপর্যায়ে মুহূর্তের মধ্যেই হিসাবের সব টাকা সরিয়ে ফেলে চক্রটি।
আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য এত দ্রুত প্রতারকদের হাতে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, আবেদন জমা দেওয়ার পরই নাম, মোবাইল নম্বর ও আবেদনের অবস্থা জেনে প্রতারকরা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বার্তা পাঠাতে পারছে। ফলে তথ্য ফাঁসের উৎস, পাসপোর্টের আবেদন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তথ্য সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে উঠেছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/০২/১১/২০২৬