এস এ খান শিল্টু: তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরমের মধ্যে মেহেরপুরে পল্লী বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট আরও বেশি। অনেক এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মানুষজন চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
তবে এই সংকট কবে নাগাদ কাটবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন এলাকা নিয়ে গঠিত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় রয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, জীবননগর, দামুড়হুদা ও মেহেরপুরের বিভিন্ন অঞ্চল। দুটি গ্রিড (চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া) এবং ১২টি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ ২৪ হাজার ৬০০ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে সমিতির পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩৭ মেগাওয়াট।
মেহেরপুর জেলায় মোট গ্রাহকের সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯৮৮ জন, বাণিজ্যিক গ্রাহক ৯ হাজার ৭০০ জন, শিল্প সংযোগ ২ হাজার ১৭৫টি, সেচ পাম্প ৩ হাজার ৪২৩টি এবং অন্যান্য সংযোগ রয়েছে ২ হাজার ৮৭১টি।
চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম
মেহেরপুর অঞ্চলে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজন ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে এর চেয়ে অনেক কম।
অফ-পিক সময়ে (রাত ১২টা থেকে বিকেল ৫টা) ৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে ঘাটতি থাকছে ১৫ মেগাওয়াট, যা প্রায় ২৭ শতাংশ লোডশেডিং।
পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা) ৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৪১ মেগাওয়াট। এ সময়ে ঘাটতি থাকছে ২১ মেগাওয়াট, অর্থাৎ লোডশেডিং হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ।
তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, দাপ্তরিক হিসাবের চেয়েও বাস্তবে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈষম্য রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
সেচ সংকটে কৃষক, ক্ষতির আশঙ্কা ফসলের
মেহেরপুরে প্রায় এক মাস ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। প্রচণ্ড রোদে মাঠের ফসল টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত সেচ দিতে হচ্ছে কৃষকদের। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সদর উপজেলার ঝাওবাড়িয়া গ্রামের কৃষক মুন্তাজ আলী জানান, এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে গেলে তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। পরে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিদ্যুৎ আসে। এতে খরচ বাড়ছে এবং সময়মতো সেচ দিতে না পারায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পড়াশোনা ও ব্যবসায় প্রভাব
অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলাকালে রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। সদর উপজেলার পরীক্ষার্থী সিমা আক্তার ও কলেজ শিক্ষার্থী নুসরাত জামান জানান, রাতের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরাও। গাংনীর সাহারবাটী বাজারের ওয়েল্ডিং ব্যবসায়ী বিষু কর্মকার জানান, বিদ্যুৎ না থাকলেও শ্রমিকদের দৈনিক ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা হাজিরা দিতে হচ্ছে। ফলে কাজ বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।
ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবাও
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার চারটি সরকারি হাসপাতাল এবং অর্ধশতাধিক বেসরকারি ক্লিনিকে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জেনারেটর সুবিধা না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়।
কর্তৃপক্ষ বলছে, জাতীয় গ্রিডে সংকট
বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকার মানুষ কয়েক দফায় বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেছেন।
মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) স্বদেশ কুমার ঘোষ জানান, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কম পাওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। শহরাঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তিনি বলেন, সংকট সমাধানে গত ২৮ জুন জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী জানান, জেলার সব এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডের সমস্যা সমাধান হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
সানা/আপ্র/৪/৮/২০২৬