গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬

মেনু

মাদক নিয়ন্ত্রণে কথার চেয়ে কাজ জরুরি

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৪৬ পিএম, ০৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫৯ এএম ২০২৬
মাদক নিয়ন্ত্রণে কথার চেয়ে কাজ জরুরি
ছবি

ছবি সংগৃহীত

মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী

একটি সমৃদ্ধ, মেধাভিত্তিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের যুবসমাজ। কিন্তু আজ অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সেই তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এক গভীর অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। মাদক- যা এক নিঃশব্দ ঘাতক- আজ ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দেশকে মাদকমুক্ত করার যে স্বপ্ন আমরা বুনেছিলাম, উপযুক্ত তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের অভাবে তা আজ প্রায় ধূলিসাৎ হতে চলেছে। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে নেশামুক্ত করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখন শুধু প্রথাগত অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং নিয়মিত, কঠোর ও কোমর বেঁধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

সম্প্রতি ঢাকার বাইরে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে পোস্টার নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক স্লোগান দিয়ে রাজপথে পদযাত্রা করতে দেখে সাময়িকভাবে মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের এই দূরদর্শী কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই ছিল সমাজকে জাগ্রত করা এবং যুবসমাজকে ধ্বংসাত্মক নেশার পথ থেকে ফেরানো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোমলমতির এই রাজপথ পরিক্রমা আমাদের যেমন আশান্বিত করে, তেমনি দেশের বর্তমান সামগ্রিক চিত্র সাধারণ ও সচেতন নাগরিকদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত না করে পারে না।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী- যাদের হাতে থাকার কথা ছিল বই ও ভবিষ্যতের প্রদীপ্ত স্বপ্ন- তারা আজ বিড়ি, সিগারেট থেকে শুরু করে ভয়াবহ সব মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বেচাকেনার নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে; ঘরে বসেই ডিজিটাল মাধ্যমের সুযোগ নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে মরণনেশা। সীমান্ত পেরিয়ে যেভাবে সীমান্তরক্ষা বাহিনী, কোস্টগার্ড কিংবা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমার ও প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে স্থল, নদী ও আকাশপথে মাদকের চালান ঢুকছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। প্রশ্ন ওঠে- এতসব প্রতিরোধ ব্যবস্থা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতিনিয়ত মাদকের বিশাল চালান দেশে প্রবেশ করে? এখানে কী অবহেলা, উদাসীনতা নাকি কোনো সুবিধাবাদী বাণিজ্য কাজ করছে? নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির মারাত্মক অভাবেই মূলত আজ বাংলাদেশের যুবসমাজ নেশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদকের এই করাল গ্রাস থেকে বাদ যাচ্ছে না তরুণী ও গৃহবধূরাও। বিত্তবান পরিবারের তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে অভিজাত বার ও রেস্তোরাঁগুলোতে মাঝে মধ্যে পুলিশের অভিযানে আটকের চিত্র দেখা গেলেও ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে মাদকের বিস্তার ঘটলেও সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো পক্ষ থেকেই প্রতিরোধমূলক দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।

মাদকের ভয়াবহতার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে নতুন এক স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে দেখা দিয়েছে মরণব্যাধি এইডস। দেশের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তরুণ-তরুণী ও গৃহবধূরা শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করায় তাদের মধ্যে খুব দ্রুত এইচআইভি বা এইডস ছড়িয়ে পড়ছে। ইনজেকশনের একই সূচ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করায় সংক্রমণ দ্রুত জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অন্যদিকে গন্ধহীন গুঁড়া মাদক (যেমন- হেরোইন বা নানা সংশ্লেষিত কেমিক্যাল) সহজেই শিক্ষার্থী ও তরুণের নাগালে চলে আসছে। নেশায় ক্ষণিকের যে ভুয়া তৃপ্তি আছে- এমন ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে যে পথ তারা বেছে নিচ্ছে, এর পরিণতি হচ্ছে অত্যন্ত করুণ।

পিতা-মাতা, শিক্ষক ও গুরুজনদের উপদেশ আজ আর তাদের কানে পৌঁছায় না। সন্তানকে নেশার হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে কিংবা তাদের নেশার খরচ জোগাতে গিয়ে বহু পরিবার আজ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, নেশাগ্রস্ত এসব পথভ্রষ্ট ছেলে-মেয়েকে অভিশপ্ত জীবন থেকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিরাময় ও পুনর্বাসনের যে ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ থাকা দরকার ছিল, তা একেবারেই অপ্রতুল।

একদিকে মাদকের সহজলভ্যতা, অন্যদিকে এইডসের মতো মারাত্মক ব্যাধির দ্রুত বিস্তার- সব মিলিয়ে দেশের অভিভাবক মহল আজ দিশাহারা, গভীর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা। পরিবারগুলোতে প্রতিনিয়ত অশান্তির আগুন জ্বলছে। সমাজ থেকে যে কোনো উপায়ে মাদকের এই ভয়াবহ দানবীয় প্রবণতা এখনই বন্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখোমুখি হবে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

দেশ ও সমাজকে রক্ষা করার দায়ভার আমাদের সবার। সময় পার হয়ে যাওয়ার আগেই সরকারকে কঠোর নীতি অবলম্বন করতে হবে- মাদকের উৎস বন্ধ করা, চোরাচালান রোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জোরালো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে পুরো সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং নেশামুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন চিরতরে অধরাই থেকে যাবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০৩.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

নারী ও শিশু নির্যাতন: বর্তমান বাস্তবতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা
০৩ আগস্ট ২০২৬

নারী ও শিশু নির্যাতন: বর্তমান বাস্তবতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

নিকোলাস বিশ্বাসনারী ও শিশু নির্যাতন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা অপরাধের পরিসংখ্যানগত হিসা...

দক্ষিণ এশিয়াকে অশান্ত করছে কারা?
০২ আগস্ট ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়াকে অশান্ত করছে কারা?

সুলতানা স্বাতীভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের অঞ্চলে এক ধরনের আলাদা আস্থা আছে। শুধু ভারতীয় শিক্ষার...

রোহিঙ্গা সংকট কি যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থাকবে?
০২ আগস্ট ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকট কি যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থাকবে?

সাবির মুস্তাফারোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে গত কয়েক দিনে  কিছু কথাবার্তা আবার শোনা যাচ্ছে। বিশেষ কর...

কোটা থেকে গণঅভ্যুত্থান, তবু চাকরিতে বৈষম্য দূর করা কঠিন
০১ আগস্ট ২০২৬

কোটা থেকে গণঅভ্যুত্থান, তবু চাকরিতে বৈষম্য দূর করা কঠিন

মনজুরুল আলম মুকুল১৯৭১ সালের পর এ দেশে অনেক গণআন্দোলন হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে আগে আবু সাঈদের মত কা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বেনজীরকে ফেরাতে দুবাইয়ে আইনি লড়াই শুরু সরকারের

দুবাইয়ে শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্ত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করেছে সরকার। তার জামিন আদেশ বাতিলের উদ্যোগ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 19 ঘন্টা আগে