জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের আমলেও নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার নির্দেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ৫০০-এর বেশি ভাইবোন চোখ হারিয়েছেন। দুই বছর পর আবার একজন ভাইয়ের চোখ চলে গেল। শেখ হাসিনার পথ ধরেই তারেক রহমান একজন কিশোরের চোখ কেড়ে নিয়েছেন। তিনি কোথায় গিয়ে থামবেন, সেটা তাকেই ঠিক করতে হবে।” সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীতে ‘শহীদ পরিবার ও আহতদের কণ্ঠে জনতার ১ দফা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ঐতিহাসিক ১ আগস্ট উপলক্ষে এনসিপি শহীদ পরিবার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের সঙ্গে দিনটি পালন করতে চেয়েছে। কারণ শহীদ ও আহতরাই এই আন্দোলনের প্রকৃত রূপকার। যারা সন্তান, ভাই, বাবা কিংবা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের ত্যাগের কারণেই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। শেখ হাসিনার পতনের মধ্যেই আন্দোলনের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই ছিল এর উদ্দেশ্য, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ফিরে আসতে না পারে।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, অনেকে জুলাই আন্দোলনকে শুধু শেখ হাসিনার পদত্যাগের আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরতে চান। কিন্তু ঘোষিত এক দফার লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন। তার অভিযোগ, কেউ কেউ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চেয়েছিলেন এবং এখন তারাই ক্ষমতায় রয়েছেন। ফলে আন্দোলনের আংশিক লক্ষ্য অর্জিত হলেও মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়নি, শহীদ পরিবারগুলো বিচার পায়নি, আহতদের পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়নি। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনও আসেনি। তার দাবি, গ্রামাঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কর্মসংস্থানের অভাবসহ নানা সমস্যায় মানুষের মধ্যে নতুন করে হতাশা তৈরি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বিএনপি সংস্কার ও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। তার ভাষ্য, জেলায় জেলায় অসংখ্য ‘হাওয়া মামলা’ দিয়ে বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া অনেক মামলার আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছেন।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, আহতদের দেওয়া স্বাস্থ্য কার্ড কার্যকর নয় এবং জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন ও শহীদদের কবর সংরক্ষণেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দুই বছর পরও আন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, অথচ হামলার অভিযোগে অভিযুক্তরা জামিন পাচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, অর্থনৈতিক কাঠামো ও দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠীর সংস্কার ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না।
জুলাই গণহত্যা, ওসমান হাদি হত্যা এবং গুম-খুনের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার তা করতে ব্যর্থ হলে এনসিপি ও সমমনা রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলন আরো জোরদার করবে। জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঐক্যের ভিত্তি ছিল শেখ হাসিনার পতন। এরপর সেই ভিত্তি হওয়া উচিত বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ। সরকার এসব বিষয়ে আন্তরিক হলে ঐক্য সম্ভব, অন্যথায় জনগণের আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে। জনগণ কোনো সরকারকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার অবাধ অনুমতি দেয় না। নির্বাচিত সরকারও যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না করে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৩/৮/২০২৬