ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ও পুরনো তারের ব্যবসায়ী সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে। আদালতে প্রথম সাক্ষী হিসেবে নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, হত্যাকারীরা তার ভাইয়ের লাশের ওপর উঠে উল্লাস করেছিল। সোমবার (৩ আগস্ট) ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আলমগীর হোসেনের আদালতে মামলার বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম সাক্ষ্য দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে তার ভাই সোহাগকে হত্যা করা হয়।মাহিন, টিটু, লম্বা মনির, ছোট মনির, সজিব, রাজীব, রুমান বেপারী, আবির হোসেন, আলমগীর, অপু দাস, অভি, টিটন গাজী, রবিনসহ আরো অনেকে আমার ভাইকে ইট, পাথর ও লাঠিসোটা দিয়ে মারধর করে।
মঞ্জুয়ারা আদালতে বলেন, “আমার ভাই মাটিতে পড়ে গেলে তার ডান কান কেটে ফেলে, বাম চোখ উপরে ফেলে দেয়। মাথা পাথর দিয়ে থেঁতলে জখম করে। দুই হাত ভেঙে ফেলে। মারা গেছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার পর লাশের ওপর উঠে উল্লাস করে।” কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, “এরপর তারা স্লোগান দিয়ে লাশ ফেলে চলে যায়। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে যাই। পরে স্থানীয় লোকজন, দোকানের কর্মচারী ও আশপাশের মানুষের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মামলা করি।”
সাক্ষ্য শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন। তারা দাবি করেন, ঘটনাটি তিনি নিজে দেখেননি এবং আসামিদের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা না পেয়েও মামলা করেছেন। জবাবে মঞ্জুয়ারা বলেন, “এটা মিথ্যা।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিল্লাল হোসেন জানান, সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালত আগামী ১৩ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারণ করেছেন।
গত ১২ জুলাই একই আদালত ২১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদ হাসান মাহিন, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজিব ওরফে সজিব বেপারী, টিটন গাজী, তারেক রহমান রবিন, জহিরুল ইসলাম, পারভেজ, সাগর, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, রুমান বেপারী, আবির হোসেন, জহির, ইমরান হোসেন, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার, জিয়াউদ্দিন রাজিব, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে ছোট মনির ও অপু দাস।
আসামিদের মধ্যে ১০ জন কারাগারে রয়েছেন, ৮ জন পলাতক এবং ৩ জন জামিনে রয়েছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৯ জুলাই বিকালে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে কংক্রিটের বোল্ডার দিয়ে শরীর ও মাথায় আঘাত করে সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের অনেকেই সোহাগের পরিচিত ছিলেন। তাদের কয়েকজন একসময় তার ব্যবসার সহযোগীও ছিলেন। ব্যবসায়িক বিরোধ থেকেই এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ৮ ডিসেম্বর ২১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক মনিরুজ্জামান। পরে অভিযোগপত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকার কথা জানিয়ে অধিকতর তদন্তের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এরপর মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পরিদর্শক শাহ মো. ফয়সাল আহমেদের ওপর। তিনি ২১ আসামির বিরুদ্ধে পুনরায় অভিযোগপত্র জমা দেন।
মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় গত ২১ জুন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে ১২ জুলাই প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৩/৮/২০২৬