২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আকাঙক্ষা ছিল একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। শত শত মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন আন্দোলনকারীরা, সেই প্রত্যাশা দুই বছর পর কতটা পূরণ হয়েছে-এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে চলছে নানা আলোচনা, মূল্যায়ন ও প্রশ্ন।
জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তিতে সুশাসনের অগ্রগতি নিয়ে যেমন রয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ, তেমনি রয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদও। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণমুক্ত করা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এখন সময়ের অন্যতম দাবি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে সুশাসন অসম্ভব: জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের আকাঙক্ষা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত দলীয় প্রভাবমুক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করতে হবে এবং জনগণের কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করে প্রায় ১২টি সংস্কার কমিশন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষা ও পুলিশসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, প্রশাসনিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনই সুশাসনের মূল ভিত্তি হতে পারে।
পাঁচ মাসে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়: আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, গণহত্যার বিচার এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
তার মতে, স্বাধীন বিচার বিভাগ, কার্যকর দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিলেও দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম পাঁচ মাসে এর সুস্পষ্ট প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। তবে সরকারকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য আরো সময় দেওয়া প্রয়োজন।
দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, সুশাসন কোনো একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত প্রায় ১৫টি সংস্কার কমিশন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যেই কাজ করেছিল। এসব সুপারিশকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা উচিত।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ইতিবাচক: গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এখনো বড় ধরনের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা তথাকথিত ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা বন্ধ হওয়া একটি ইতিবাচক দিক।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সময় প্রয়োজন। আশা করা যায়, ধীরে ধীরে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি হবে।
সরকারের দাবি, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার: জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সুশাসনের অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বলেন, দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল।
তবে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছেন। পাশাপাশি অস্থিরতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ কতটা এগিয়েছে-এ প্রশ্নের উত্তর এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই-রাষ্ট্র যেন সত্যিকার অর্থে জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার পথে এগিয়ে যায়।
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬