ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক চাপ বাড়িয়েও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর দৃশ্যমান সাফল্য না আসায় এখন নতুন করে কূটনৈতিক বিকল্প নিয়ে ভাবতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানো, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা-সবকিছু মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সামরিক অভিযান আরো বাড়ানো কিংবা ইরানের প্রভাব মেনে নিয়ে সমঝোতার পথে যাওয়া-দুই পথই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিসের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টিন বলেন, “আমরা সত্যিই এক গভীর উভয় সংকটের মধ্যে পড়েছি।”
যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পরিবহন করা হয়। এ পথ দীর্ঘ সময় অচল থাকলে বিশ্বজুড়ে তেলের সংকট, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপে আসন্ন শীত মৌসুমে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের অনেক সরকারও জনঅসন্তোষের মুখে পড়ছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে: যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে ইরান পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে তাঁর নীতির প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংকট ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ ২০২৪ সালের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি সমর্থন পেয়েছিলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট সেই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
হরমুজ নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা: কূটনৈতিক মহলের ধারণা, সংকট নিরসনে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে। এতে ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি সমঝোতা হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি পরাজয় স্বীকার না করেও সংকট থেকে বের হওয়ার পথ পেতে পারে। অন্যদিকে ইরানও দাবি করতে পারবে, তারা সংঘাতের মধ্যেও নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ওমান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগের একটি সম্ভাব্য সেতু হিসেবে কাজ করে আসছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে ওমান ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে।
‘হরমুজ ফি’ নিয়ে আলোচনা: কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষ আর্থিক কাঠামোর ধারণা দিয়েছেন। এর আওতায় জলপথ ব্যবহারের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। কারণ এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িত।
কূটনীতিতে আস্থার সংকট: বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্কের টানাপোড়েনও সংকট সমাধানে বাধা তৈরি করছে। অতীতে ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সমন্বয় দুর্বল হয়েছে।
ব্রাসেলসভিত্তিক জার্মান মার্শাল ফান্ডের ডিস্টিংগুইশড ফেলো ইয়ান লেসার বলেন, ইউরোপের সহযোগিতা চাওয়া এক বিষয়, কিন্তু তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্পষ্ট ও সর্বসম্মত কৌশল প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথেই ফিরতে হবে: বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যেমন কঠিন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ব্যয়বহুল। তাই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত একটি কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খুঁজতেই হবে।
লাইল গোল্ডস্টিনের মতে, সম্ভাব্য সমঝোতাটি হবে অত্যন্ত কঠিন ও অস্বস্তিকর। তবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আলোচনার বিকল্প ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
এখন বড় প্রশ্ন-ওয়াশিংটন ও তেহরান কি সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে, যা উভয় পক্ষের জন্য রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে?”
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬