বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ চীনে প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের এক সামুদ্রিক সরীসৃপের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন, যেখানে প্রাণীটির পেট, যকৃৎ ও সম্পূর্ণ পরিপাকতন্ত্র অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। ডাইনোসরের আবির্ভাবের আগের যুগের এই জীবাশ্ম প্রাচীন সরীসৃপদের দেহগঠন ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে নতুন তথ্যের দ্বার খুলে দিয়েছে।
গবেষকদের মতে, ট্রায়াসিক যুগের অস্ট্রোনাগা মিনিটাস প্রজাতির এ প্রাণীটির জীবাশ্ম দক্ষিণ চীনের ইউনান প্রদেশে পাওয়া গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ মহাবিলুপ্তির পর জীবনের নতুন বিকাশের সময়কার এই অঞ্চলে সংরক্ষিত জীবাশ্মের সন্ধান প্রায়ই পাওয়া যায়।
জীবাশ্ম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অস্ট্রোনাগার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় দুই ফুট। এর মাথা ছিল তুলনামূলক ছোট, মুখ ছিল সরু এবং সেখানে ছিল ধারালো দাঁত। এসব দাঁত পিচ্ছিল মাছ শিকারের জন্য উপযোগী ছিল বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
প্রাণীটির ছিল দীর্ঘ ঘাড়, দীর্ঘ দেহকাণ্ড এবং দেহের চেয়েও দীর্ঘ লেজ। দ্রুত সাঁতারের জন্য সামনের দিকে বড় আকারের ফ্লিপারের মতো অঙ্গ এবং পেছনে ছোট ফ্লিপার ছিল। লেজের সাহায্যে এটি মূলত গতি নিয়ন্ত্রণ করত এবং সামনের বড় অঙ্গ দুটি দিয়ে পানিতে দিক পরিবর্তন করত। দীর্ঘ ঘাড় বাড়িয়ে সহজেই শিকার ধরতে পারত এ প্রাণী।
গবেষকদের মতে, অস্ট্রোনাগা ছিল আর্কোসর গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এই গোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমান কুমির, বিলুপ্ত ডাইনোসর, উড়ুক্কু সরীসৃপ টেরোসর এবং আধুনিক পাখির পূর্বপুরুষ রয়েছে।
অক্ষত অন্ত্রের বিরল আবিষ্কার: জীবাশ্মটির কঙ্কালের অধিকাংশ অংশ প্রাণীটির জীবিত অবস্থার মতোই সংরক্ষিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর অভ্যন্তরীণ অঙ্গের উপস্থিতি। বিশেষ করে সম্পূর্ণ পরিপাকতন্ত্রের সুস্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন সরীসৃপের জীবাশ্মে অত্যন্ত বিরল।
জার্মানির স্টুটগার্ট স্টেট মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি ও ইউনিভার্সিটি অব হোহেনহাইম-এর জীবাশ্মবিদ এবং গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক স্টিফান স্পিকম্যান বলেন, সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া সরীসৃপদের মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো পরিপাকতন্ত্রের নিদর্শন।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ।
জীবাশ্ম থেকে জানা গেছে, অস্ট্রোনাগার পাকস্থলী ছিল এক প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট। আধুনিক পাখি, কুমির ও কিছু ডাইনোসরের মতো এর দ্বি-প্রকোষ্ঠ পাকস্থলী ছিল না। এর অর্থ, আর্কোসর গোষ্ঠীর বিবর্তনের শুরুতেই জটিল পরিপাক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি; পরবর্তী সময়ে বিবর্তনের ধারায় তা বিকশিত হয়েছে।
জীবাশ্মেও টিকে আছে যকৃতের রং: বিস্ময়করভাবে, প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ বছরের পুরোনো জীবাশ্মেও প্রাণীটির যকৃতের লালচে রং শনাক্ত করা গেছে। গবেষকেরা জানান, জীবাশ্মে লৌহযুক্ত হিমোগ্লোবিনের অবশিষ্টাংশ পাওয়ার কারণে এমনটি সম্ভব হয়েছে।
হিমোগ্লোবিন হলো রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, যা শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করে। এতে থাকা লৌহের কারণেই রক্তের রং লাল হয়।
যকৃতের পেছনে ছিল নলাকার দীর্ঘ অন্ত্র, যা ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্রের অংশ গঠন করেছিল। গবেষকদের মতে, অস্ট্রোনাগার পরিপাকতন্ত্র ছিল তুলনামূলক সরল। এটি শিকারি প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ মাছের মতো প্রাণী হজম করা উদ্ভিদভোজী খাবারের তুলনায় সহজ।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, অস্ট্রোনাগার অন্ত্রের ভেতরে মাছের আঁশের মতো খাদ্যের অবশিষ্টাংশ ছিল। অর্থাৎ মৃত্যুর আগে এটি মাছ খেয়েছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
মহাবিলুপ্তির পর নতুন জীবনের প্রতিনিধি: প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর আগে পার্মিয়ান যুগের শেষভাগে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাবিলুপ্তির ঘটনা ঘটে। এরপর সমুদ্র ও স্থলে নতুন নতুন প্রাণী গোষ্ঠীর বিকাশ শুরু হয়। সেই সময় স্থলচর সরীসৃপদের কয়েকটি দল সমুদ্রের পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়।
অস্ট্রোনাগাও ছিল সেই অভিযোজনের একটি উদাহরণ। বিষুবরেখার কাছাকাছি উষ্ণ ও অগভীর সমুদ্রে এদের বিচরণ ছিল। ওই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মাছ ও সামুদ্রিক সরীসৃপের বসবাস ছিল। একই সময়ে নোথোসরের মতো বড় আকারের শিকারি প্রাণীও সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
তবে উদ্ধার হওয়া অস্ট্রোনাগা পূর্ণবয়স্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিত নন গবেষকেরা। স্টিফান স্পিকম্যান বলেন, মৃত্যুর সময় প্রাণীটি পুরোপুরি বেড়ে উঠেছিল কি না জানা যায়নি। তবে এটি সম্ভবত ছোট আকারের সামুদ্রিক সরীসৃপ ছিল এবং কয়েক মিটার দীর্ঘ হওয়ার মতো বড় ছিল না। তথ্যসূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬