গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬

মেনু

মান্টোর ‘খোল দো’ থেকে নির্মিত ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ স্মরণ করিয়ে দিলো বিভাজনের ভয়াবহ ইতিহাস

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে মঞ্চে মানবতার আর্তনাদ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:২৬ পিএম, ০১ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৩৬ এএম ২০২৬
দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে মঞ্চে মানবতার আর্তনাদ
ছবি

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

আবু তাহের, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: নাটক কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়; এটি সময়, সমাজ ও ইতিহাসের আয়না। মঞ্চের আলো-আঁধারিতে কখনো কখনো এমন কিছু গল্প উঠে আসে, যা দর্শককে শুধু আবেগতাড়িতই করে না, বরং দাঁড় করিয়ে দেয় অতীতের কঠিন সত্যের মুখোমুখি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে ভারতের কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গন নাট্যসংস্থার পরিবেশিত ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ ঠিক তেমনই এক মর্মস্পর্শী নাট্যপ্রয়াস।

১২ থেকে ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে প্রদর্শিত এই নাটকটি সাদাত হাসান মান্টোর কালজয়ী ছোটগল্প ‘খোল দো’-এর ভাবনা অবলম্বনে নির্মিত। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন তুষার রায় ও দীপক নায়েক। দেশভাগের নির্মমতা, উদ্বাস্তু মানুষের অসহায়ত্ব, সাম্প্রদায়িক হিংসার ভয়াবহতা এবং নারীর ওপর সংঘটিত বর্বরতার চিত্র ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শক্তিশালী ভাষায় মঞ্চে তুলে ধরেছে।

সাদাত হাসান মান্টো ছিলেন উপমহাদেশের ইতিহাসের এক নির্মোহ কথাকার। দেশভাগের রক্তাক্ত অধ্যায়কে তিনি দেখেছেন মানুষের চোখ দিয়ে। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সেইসব মানুষের আর্তনাদ, যাদের জীবন রাজনীতির মানচিত্র বদলের নিষ্ঠুরতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ সেই বেদনারই এক গভীর পুনর্পাঠ।

নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র সিরাজউদ্দিন ও তার মেয়ে সাকিনা। কিন্তু তারা শুধু দুটি চরিত্র নয়; তারা দেশভাগে হারিয়ে যাওয়া লাখো মানুষের প্রতীক। নাটকের শুরুতে দেখা যায় একটি ছোট্ট সংসার-যেখানে অভাব থাকলেও ছিল ভালোবাসার উষ্ণতা। স্ত্রী আসমা বিবিকে হারানোর পর মেয়েকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে ছিলেন সিরাজউদ্দিন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিভেদের আগুনে সেই শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে যায়।

দেশভাগের উত্তাল সময়ে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে যায় ভূখণ্ড। মানুষ হারায় ঘর, পরিচয়, নিরাপত্তা ও স্বজন। সেই ভয়াবহ বাস্তবতায় সিরাজউদ্দিন ও সাকিনা ট্রেনে চড়ে নতুন ঠিকানার সন্ধানে রওনা হয়। কিন্তু অস্থিরতার মধ্যে হারিয়ে যায় সাকিনা। বাবার কাছে পড়ে থাকে শুধু মেয়ের একটি ওড়না-যা হয়ে ওঠে হারানো ভালোবাসা ও অপেক্ষার প্রতীক।

এরপর শুরু হয় এক হৃদয়বিদারক অনুসন্ধান। একদিকে সন্তান হারানো বাবা সিরাজউদ্দিন ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে ঘুরে মেয়েকে খুঁজে বেড়ান, অন্যদিকে সাকিনা খুঁজতে থাকে তার প্রিয় ‘আব্বু’কে। কিন্তু যে সমাজে সে ফিরে আসে, সেখানে মানবিকতার জায়গা দখল করে নিয়েছে নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা ও অবিশ্বাস।

নাটকের সবচেয়ে বেদনাবিধুর মুহূর্ত আসে শেষ দৃশ্যে। হাসপাতালে জীবিত অবস্থায় সাকিনাকে খুঁজে পান সিরাজউদ্দিন। কিন্তু নির্যাতনের ক্ষত শুধু তার শরীরে নয়, তার মনোজগতেও গভীর দাগ কেটে গেছে। ‘খোল দো’-এই দুটি শব্দ তার কাছে আর সাধারণ কোনো নির্দেশ নয়; এটি হয়ে ওঠে ভয়, অপমান ও হারিয়ে যাওয়া নিরাপত্তার ভয়ংকর প্রতিধ্বনি।

যখন সাকিনা নিজের বাবাকেও চিনতে পারে না, তখন সিরাজউদ্দিনের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ-‘আমি শুধু পুরুষ না রে, আমি তোর বাপ’-দর্শকের হৃদয়ে গভীর শোকের অনুরণন তোলে। এই সংলাপ যেন শুধু একজন পিতার কান্না নয়, এটি সমগ্র মানবতার আর্তনাদ।

‘পঞ্চমীর চাঁদ’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশভাগ কেবল মানচিত্রের বিভাজন ছিল না; এটি ছিল মানুষের স্বপ্ন, সম্পর্ক ও বিশ্বাসেরও বিভাজন। সাত দশক পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত এখনো ইতিহাসের পাতায় এবং মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত।

বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের নামে নতুন নতুন বিভাজন তৈরি হচ্ছে, তখন এই নাটক এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়-মানুষের পরিচয় কোনো বিভাজনের দেয়ালে আটকে থাকতে পারে না। মানবিকতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবের মঞ্চে ‘পঞ্চমীর চাঁদ’-এর সাফল্য প্রমাণ করেছে, শিল্পের কোনো সীমান্ত নেই। সত্যিকারের শিল্প মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়, ইতিহাসের গভীর ক্ষতকে স্পর্শ করে এবং মানুষকে আরো মানবিক হওয়ার আহ্বান জানায়।

দেশভাগের বেদনা, নারীর ওপর সহিংসতার নির্মম বাস্তবতা এবং মানবতার চিরন্তন আকুতিকে ধারণ করে ‘পঞ্চমীর চাঁদ’ হয়ে উঠেছে এক অনন্য নাট্যদলিল-যা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়।
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

শেষ ফোনকল
৩১ জুলাই ২০২৬

শেষ ফোনকল

ছোটগল্প===

কবিতা
৩১ জুলাই ২০২৬

কবিতা

বাবা-সুপারহিরোপূর্ণিয়া সামিয়াতোমাকে বলা হয় না ভালোবাসি,তোমার গাম্ভীর্যতায়এক পৃথিবী আদর মাখা,তোমার শা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই