সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মেট্রো স্টেশনে এক অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে কেবল হাফপ্যান্ট পরার কারণে পুলিশের হেনস্তার শিকার হতে হয়- যা নাগরিক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একজন ক্রীড়াবিদ বা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের স্বাভাবিক পোশাককে ‘অশালীন’ বা নিয়মবহির্ভূত আখ্যা দিয়ে এভাবে আটক রাখা বা জিজ্ঞাসাবাদ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও জনবহুল গণপরিবহনে এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা কেবল ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপই নয়, বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের মনস্তাত্ত্বিক সংকীর্ণতা ও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দেশের কয়েক তরুণ ও ক্রীড়াপ্রেমী যেভাবে হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে চড়ে অভিনব অথচ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছেন, তা সামাজিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী এক বার্তা দেয়। এই অভিনব প্রতিবাদ আমাদের সমাজের একটি গভীর সত্যকে উন্মোচন করেছে- সমস্যাটি আদতে শর্টস বা কোনো বিশেষ পোশাকের নয়, সমস্যা হলো মানুষের রক্ষণশীল ও নেতিবাচক মানসিকতার। এই ধরনের ঘটনা শুধু ক্রীড়াঙ্গনকে কলুষিতই করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। এই অবস্থার দ্রুত অবসান ঘটাতে হলে কেবল মৌখিক নিন্দা বা সমবেদনা প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
বলা বাহুল্য- দৌড়বিদ, অ্যাথলেট বা শরীরচর্চাকারীদের জন্য হাফপ্যান্ট কিংবা শর্টস একটি অতি পরিচিত, আরামদায়ক ও প্রয়োজনীয় স্পোর্টসওয়্যার। খেলাধুলার মাঠে শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য, গতিশীলতা ও আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট পোশাক বা ক্রীড়াশৈলী বেছে নেওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিষয়। অথচ ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রয়োজনকে পাশ কাটিয়ে পুলিশ বা রক্ষণশীল গোষ্ঠী নৈতিকতার প্রহরী সেজে সাধারণের ওপর নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ চাপিয়ে দিতে চায়। একজন অ্যাথলেট বা প্রশিক্ষক দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। ওই অবদানকে মূল্যায়ন না করে তাদের পোশাকের দৈর্ঘ্য মাপতে ব্যস্ত থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অতীতেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে পোশাক ও চলাফেরাকে নিয়ন্ত্রণ করার অপচেষ্টা দেখা গেছে- যা স্বাধীন একং গণতান্ত্রিক সমাজের মূল চেতনার পরিপন্থী। এ জন্য ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে- যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে সহায়ক হবে। প্রতিবাদী তরুণরাও ঠিক ওই জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, পোশাকের চেয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন বেশি জরুরি। এই ধরনের অহিংস নাগরিক আন্দোলন প্রমাণ করে, সচেতন যুবসমাজ এখন তাদের মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করতে নারাজ এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ তারা সৃজনশীল পন্থায় করতে জানে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, হাফপ্যান্ট পরায় অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে হেনস্তা করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীরের রক্ষণশীলতা এবং তাদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক অসম্মানের চিত্র উন্মোচন করে। এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা মনস্তত্ত্ব কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ- যা সময়মতো প্রতিহত করা না হলে তা সমাজে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্র বা জনপরিবহন পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ও লিখিত নীতিমালা থাকা বাঞ্ছনীয়- যেখানে খেয়ালখুশিমতো কোনো পোশাক নিষিদ্ধ করার অবকাশ থাকে না। অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে হেনস্তার এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ সংবেদনশীলতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের চলাফেরা বা পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা সংবিধানে সংরক্ষিত- যার সম্মান রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। আমরা আশা করি, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিক্ষা নেবে এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করে একটি সহনশীল ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে। এ ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে হেনস্তাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে- যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন ঔদ্ধত্য দেখানোর সাহস না পায়।
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬