বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত-নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু ঘোষণার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনীতি কি সেই ঘোষণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো প্রস্তুত? বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে সম্ভাবনার কথা বলা সহজ; তাদের আস্থা অর্জন করা কঠিন। আর সেই আস্থা একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করা আরো কঠিন।
প্রধানমন্ত্রী নিজেই ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছেন, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আস্থা, পূর্বানুমেয়তা ও প্রবৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ। এই তিনটি শব্দের মধ্যেই বাংলাদেশের বিনিয়োগ সংকটের বড় উত্তর নিহিত। বিনিয়োগকারী শুধু বাজারের আকার দেখেন না; তিনি দেখেন আইন কতটা নির্ভরযোগ্য, নীতি কতটা স্থিতিশীল, সিদ্ধান্ত নিতে কত সময় লাগে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কতটা, বিনিয়োগ কতটা সুরক্ষিত এবং অর্জিত মুনাফা কত সহজে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। অর্থাৎ বক্তৃতা নয়, কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থাই বিনিয়োগের প্রকৃত বিজ্ঞাপন।
২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। তরুণ ও কর্মঠ জনগোষ্ঠী, বৃহৎ বাজার এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের বড় শক্তি। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি জ্বালানি, অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, জলবায়ু অর্থায়ন, উৎপাদন, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের বিপুল সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা যত বড়ই হোক, দুর্বল প্রশাসন, জটিল বিধিবিধান, অনিশ্চিত নীতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলে সেই সম্ভাবনা বিনিয়োগে রূপ নেবে না।
সরকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা জোরদার, বিধিবিধান সরলীকরণ, কর ও মূল্য সংযোজন কর প্রশাসনের উন্নয়ন, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলেছে। এখন আর ঘোষণার পুনরাবৃত্তি নয়, চাই সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন। কোন দপ্তরে বিনিয়োগ আটকে আছে, কেন আটকে আছে, কত দিনে নিষ্পত্তি হবে-এসব প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। এক জানালা পদ্ধতি যদি হয়, তবে সেটি যেন আরেক দপ্তরের দরজা খোলার জন্য নতুন দরজা না হয়।
নিউইয়র্ক সফরে আট দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কূটনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত পরিমাপ হবে দেশে কত বিনিয়োগ এলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কতটা প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর হলো-তার ভিত্তিতে।
দেশি বিনিয়োগকারীদের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যে পরিবেশ চাওয়া হচ্ছে, একই পরিবেশ দেশি উদ্যোক্তারও অধিকার। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাজার ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না বাড়ালে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। পুঁজিবাজারকে স্বচ্ছ ও কার্যকর করা, জ্বালানি ও অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও সমান জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকার স্বল্পমেয়াদি লেনদেন নয়, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব চায়। সেই অংশীদারত্বের ভিত্তি হতে হবে আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। কোনো বিনিয়োগকারী যেন ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তার ওপর ভরসা করতে পারেন-এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
ওয়াল স্ট্রিটে বাংলাদেশকে উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশের প্রতিটি দপ্তর, প্রতিটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি নীতিনির্ধারকের সামনে একটিই পরীক্ষা-সেই উন্মুক্ততার প্রমাণ তারা বাস্তবে দিতে পারেন কি না। বিনিয়োগকারী প্রতিশ্রুতির শব্দ গুনবেন না; তিনি দেখবেন, দরজা সত্যিই খোলা কি না। তাই এখন সময় ঘোষণার নয়, আস্থা প্রতিষ্ঠার। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের গন্তব্য করতে হলে প্রথমে বাংলাদেশকেই বিনিয়োগকারীর আস্থার রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।
সানা/আপ্র/২৮/৯/২০২৬