‘এটা আবার কেমন প্রশ্ন!’—কখনো কারো মুখে এমন কথা শুনে নিজের প্রশ্নটি আর করা হয়নি? হয়তো কোনো বিষয় বুঝতে পারেননি, কিন্তু আশপাশের সবাই জানেন ভেবে আর জানতে চাননি। কখনো আবার মনে হয়েছে, প্রশ্ন করলে অন্যরা আপনাকে কম বুদ্ধিমান ভাবতে পারেন। অথচ যে প্রশ্নকে আমরা ‘বোকা’ ভেবে এড়িয়ে যাই, অনেক সময় তার উত্তর থেকেই শুরু হয় নতুন কিছু শেখা।
একজনের কাছে যে প্রশ্ন খুব সাধারণ, অন্য কারো কাছে সেটিই হতে পারে অজানা কিছু জানার সুযোগ। তাই কোনো প্রশ্নকে শুরুতেই বোকা কিংবা অদ্ভুত বলে উড়িয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে কমে যায় প্রশ্ন করার সাহস
ছোটবেলায় আমাদের মনে এমন সংকোচ খুব একটা থাকে না। আকাশ নীল কেন, চাঁদ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে কেন, পিঁপড়েরা এত ছোট হয়েও সারি বেঁধে হাঁটে কীভাবে কিংবা মাছ পানির নিচে শ্বাস নেয় কীভাবে—এমন অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে বড়দের ব্যস্ত করে তুলি আমরা।
উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন করতেই থাকি। কেউ হয়তো এসব প্রশ্ন শুনে হাসেন, আবার কেউ ধৈর্য ধরে উত্তর দেন। কারণ শিশুর কৌতূহলকে স্বাভাবিকভাবেই দেখা হয়।
সমস্যা শুরু হয় বড় হওয়ার পর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে শিখি, সমাজে কিছু প্রশ্নকে বুদ্ধিদীপ্ত আর কিছু প্রশ্নকে বোকামি মনে করা হয়। ফলে অনেকেই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করেন।
কর্মক্ষেত্রে কোনো বিষয় বুঝতে না পারলেও অনেকে চুপ করে থাকেন। বন্ধুর কাছে অপরিচিত কোনো শব্দের অর্থ জানতে সংকোচ করেন। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারলেও অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে দ্বিধায় পড়েন।
এর পেছনে কাজ করে একটি সাধারণ আশঙ্কা—সবাই বিষয়টি জানেন, শুধু আমি জানি না। কিন্তু কোনো বিষয় না জানা লজ্জার নয়। বরং জানার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সংকোচের কারণে প্রশ্ন না করা শেখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ছোট প্রশ্ন থেকেই বড় কিছু শেখা সম্ভব
একটি প্রশ্ন নতুন ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে। ‘কেন’ দিয়ে শুরু হওয়া প্রশ্ন থেকে জন্ম নিতে পারে আরো অনেক প্রশ্ন। সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যেতে পারে নতুন তথ্য।
ধরা যাক, আপনি রান্নার একটি ভিডিও দেখছেন। হঠাৎ মনে হলো, রান্নার শুরুতেই পেঁয়াজ ভাজা হয় কেন? এটি কি শুধু স্বাদের জন্য, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে?
প্রশ্নটি খুব সাধারণ মনে হলেও এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন, তাপের প্রভাবে খাবারের গন্ধ, স্বাদ ও রঙে নানা পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ একটি ছোট প্রশ্ন থেকেই নতুন একটি বিষয় শেখার সুযোগ তৈরি হলো।
কর্মক্ষেত্রেও প্রশ্ন করার গুরুত্ব রয়েছে। কোনো কাজের পদ্ধতি বুঝতে না পারলে চুপচাপ ভুল করার চেয়ে প্রশ্ন করে বিষয়টি পরিষ্কার করে নেওয়া বেশি কার্যকর।
কোনো কাজ কেন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে করতে হবে কিংবা সেটি করার বিকল্প কোনো উপায় রয়েছে কি না—এ ধরনের প্রশ্ন অনেক সময় কাজকে আরো সহজ করে দিতে পারে।
প্রশ্ন করারও রয়েছে সীমারেখা
তবে কৌতূহলী হওয়া আর অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা হস্তক্ষেপ করা এক বিষয় নয়। কারো ব্যক্তিগত জীবন, আয়, সম্পর্ক, শারীরিক অবস্থা কিংবা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে এমন প্রশ্ন করা উচিত নয়, যাতে তিনি অস্বস্তিতে পড়েন।
প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে সময়, স্থান ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রকৃত কৌতূহলের উদ্দেশ্য অন্যকে ছোট করা নয়; বরং নিজের জানার পরিধি বাড়ানো।
শিশুর কৌতূহলকে উৎসাহিত করুন
শিশুদের প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে বড়দের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু বারবার প্রশ্ন করলে বিরক্ত হয়ে তাকে থামিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ধৈর্য ধরে উত্তর দেওয়া প্রয়োজন।
উত্তর জানা না থাকলে শিশুর সঙ্গে মিলে তা খুঁজে দেখা যেতে পারে। এতে শিশু বুঝতে শেখে, প্রশ্ন করা কোনো অপরাধ নয়; বরং নতুন কিছু জানার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
শিশুর প্রশ্নকে গুরুত্ব দিলে তার কৌতূহল ও শেখার আগ্রহ আরো বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিজের অজানা বিষয় নিয়েও প্রশ্ন করার সাহস পায় সে।
সংকোচ কাটিয়ে আজই প্রশ্ন করুন
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর, বোকা প্রশ্ন করার দিন। দিনটি হতে পারে মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলো করার একটি উপলক্ষ।
যে শব্দটির অর্থ জানেন না, সেটি জিজ্ঞেস করুন। যে বিষয়টি বুঝতে পারছেন না, তা জানতে চান। কোনো তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ হলে যাচাই করুন। মাথায় ঘুরতে থাকা অদ্ভুত প্রশ্নটিও সুযোগ বুঝে করে ফেলুন।
জীবনের অনেক বড় আবিষ্কার, নতুন ধারণা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে একটি প্রশ্ন থেকে। তাই কোনো প্রশ্নকে বোকা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার আগে তার পেছনের কৌতূহলকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সব উত্তর জানা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন করার অভ্যাস মানুষকে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার সুযোগ করে দেয়। তাই কৌতূহল বাঁচিয়ে রাখুন, প্রয়োজন বুঝে প্রশ্ন করুন এবং উত্তর খুঁজতে থাকুন। কারণ অজানাকে জানার প্রথম ধাপই হলো প্রশ্ন করা।
সূত্র: মিডিয়াম ও গ্রেট পিপল ইনসাইড।
এসি/আপ্র/২৮/৯/২০২৬