রাজধানীর বুকে মধ্যরাতে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুখোশধারী বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে, নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করেছে, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে, ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পাকা ও সেমিপাকা ভবন ধ্বংস করেছে-এমন অভিযোগ নিছক একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদহানি নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হচ্ছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এমন দুঃসাহস কারা এবং কীভাবে দেখানোর সুযোগ পেলো?
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে সংঘটিত এই ঘটনায় দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও টিকাদানের সামগ্রী লুট হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ধ্বংস করা হয়েছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা প্রায় পাঁচ দশক ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দরিদ্র ও অসহায় মা ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছিল। ফলে এই হামলার অভিঘাত শুধু ভবন বা সম্পদের ওপর পড়েনি; বিপন্ন হয়েছে অসংখ্য মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার।
ঘটনাটি জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রে ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, প্রায় ১০ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা হানিফ মিয়ার নেতৃত্বের অভিযোগ উঠেছে। তবে হানিফ মিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এবং সেখানে কী ঘটেছে, তা তিনি জানেন না। ফলে কারা হামলা করেছে, কার নির্দেশে করেছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল-এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে হবে। পুলিশ ইতোমধ্যে মামলা নিয়েছে এবং হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতপরিচয় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ, দ্রুত ও দৃশ্যমান তদন্ত।
কিন্তু তদন্তের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে আরো বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কোনো জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তির জন্য আদালত আছে, প্রশাসন আছে, আইন আছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পছন্দ না হলে একটি প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলা, মালামাল লুট করা কিংবা জবরদখল করা কোনোভাবেই বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি হতে পারে না। তা হলে আইনের অস্তিত্বই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে শক্তির মালিক ব্যক্তি নয়, আইন। যে মুহূর্তে কোনো গোষ্ঠী মনে করে তারা জনসমক্ষে আইন অমান্য করেও পার পেয়ে যাবে, সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হতে শুরু করে। রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাতের আঁধারে শত শত মানুষ একত্র হয়ে একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে চলে যেতে পারা তাই গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সরকারের দায়িত্ব এখন দ্বিমুখী। প্রথমত, হামলায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধ্বংস হওয়া স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির কার্যক্রম পুনরায় দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দরিদ্র মা ও শিশুরা সেবাবঞ্চিত না হয়। একই সঙ্গে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বৈধ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে।
আজ রাষ্ট্র যদি আইন ভাঙার দৃশ্য দেখে নীরব থাকে, কাল আরো বড় অন্যায় সংঘটিত হওয়ার পথ তৈরি হবে। তাই মিরপুরের এই ঘটনা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি স্পষ্ট পরীক্ষা-আইন কি সত্যিই সবার ঊর্ধ্বে, নাকি ক্ষমতা ও পেশিশক্তির কাছে আইন বারবার পরাজিত হবে?
সানা/আপ্র/২৮/৯/২০২৬