হাম নিয়ন্ত্রণে টিকা আছে, প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল আছে, বিশ্বজুড়ে পরীক্ষিত জনস্বাস্থ্যব্যবস্থাও আছে। তবু বাংলাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ১০৪ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০১ জনের এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু এক হাজার তিনজনের। এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায়ও প্রাণ গেছে পাঁচজনের। একই সময়ে হাসপাতালে নতুন রোগী এসেছে এক হাজার ৩৩৯ জন। মার্চের মাঝামাঝি থেকে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৯১ হাজার এবং নিশ্চিত আক্রান্ত ২১ হাজারের বেশি। এ পরিসংখ্যান কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র নয়; এটি প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগের ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের দলিল।
প্রশ্ন তাই এড়িয়ে যাওয়ার নয়-যখন রোগটি প্রতিরোধযোগ্য, টিকা কার্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সম্পর্কে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, তখন এত মানুষ মারা গেল কেন? এর দায় কার?
হাম হঠাৎ কোনো অজানা রোগ হিসেবে বাংলাদেশে আবির্ভূত হয়নি। টিকাদানের বিস্তৃতি কমে যাওয়া, শিশুদের টিকাদান থেকে বাদ পড়া, নিয়মিত কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকা সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং সংক্রমণ বাড়ার পরও যথাসময়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে না পারা-এসব বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। যে ব্যবস্থার কাজ ছিল রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধ করা, সেই ব্যবস্থার কোথায় দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, সেটিই এখন অনুসন্ধানের বিষয়।
আর এই অনুসন্ধানের দাবি নতুন নয়। এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। গত এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিভূতি তরফদার বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর মতো গুরুতর জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন জরুরি; তদন্তে অপরাধ বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনি কাঠামোয় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। একই প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদও হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ ও শিশু মৃত্যুর দায় নির্ধারণে তদন্ত কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
এর পরও প্রশ্নের অবসান হয়নি। বরং মে মাসে হাইকোর্টে দায়ের করা জনস্বার্থের রিটে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন এবং তদন্তে যাদের দায় প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। ওই রিটে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও উত্থাপন করা হয়।
সরকার পরে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু সংকট দেখা দেওয়ার পর কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। জনস্বাস্থ্যের প্রকৃত সাফল্য হলো সংকটকে বিস্তৃত হতে না দেওয়া। আগুন লাগার পর পানি ঢালা জরুরি; কিন্তু আগুন লাগার আগেই অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার পরিচয়।
এখন প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত। টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে অনিয়ম হয়েছিল কি না, কর্মসূচি বাস্তবায়নে কোথায় গাফিলতি ছিল, সতর্কবার্তা যথাসময়ে আমলে নেওয়া হয়েছিল কি না, মাঠপর্যায়ে টিকাদানের ঘাটতি কেন তৈরি হয়েছিল এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো বিলম্ব বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না-প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসতে হবে। কোনো সরকার, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণই হবে দায় নির্ধারণের ভিত্তি।
প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার যথাযথ দায়িত্ব পালনকারী কাউকে অন্যায়ভাবে দায়ী করাও যাবে না। জবাবদিহি মানে কাউকে বলির পাঁঠা বানানো নয়; জবাবদিহি মানে সত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা।
এক হাজার ১০৪টি মৃত্যু কোনো নিছক সংখ্যা নয়-প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি শোক, একটি অপূরণীয় শূন্যতা। এই মৃত্যুগুলোকে পরিসংখ্যানের স্তূপে চাপা দেওয়া চলবে না। রাষ্ট্রকে এখনই প্রমাণ করতে হবে-প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যু ভাগ্যের লিখন নয়, আর রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার দায়ও নিয়তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে না। সত্য উদ্ঘাটিত হবে, দায় নির্ধারিত হবে, ব্যর্থতা সংশোধিত হবে। কারণ হাজার প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও যদি জবাবদিহি না আসে, তবে আগামী দিনের প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু শুধু একটি শিশুর মৃত্যু হবে না-সেটি হবে রাষ্ট্রের নীরব ব্যর্থতার নতুন সাক্ষ্য।
সানা/আপ্র/০১/১০/২০২৬