১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ, একই সঙ্গে বিতর্ক ও বেদনাবহ দিন। সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিক ও জনতার অভ্যুত্থানে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। তাঁর পরবর্তী রাষ্ট্রীয় উত্থান দেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। দিনটির স্মরণ তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনাকে উদ্যাপন নয়; রাষ্ট্রের চরিত্র, গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।
এবার দিবসটি সরকারি মর্যাদায় পালিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুর্নীতি, বৈষম্য ও ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে দলমত-নির্বিশেষে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অঙ্গীকার-ভবিষ্যতে কেউ যেন জনগণের অধিকার হরণ করে দেশকে পরাধীনতার দিকে ঠেলে দিতে না পারে। শনিবার সকালে বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি একই বার্তা দিয়েছেন। শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিকেলে নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত বিএনপির শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন, দেশজুড়ে পতাকা উত্তোলন, প্রার্থনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিশুদের জন্য নানা কর্মসূচি ছিল। এসব আয়োজনের তাৎপর্য তখনই বাড়বে, যখন উৎসবের আবহ রাজনৈতিক সহনশীলতা ও নাগরিক সংহতিতে রূপ নেবে।
সরকারি ছুটি, সরকারি-বেসরকারি ভবন ও বিদেশের দূতাবাসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, হাসপাতাল-কারাগার-এতিমখানায় বিশেষ খাবার, শিশু পার্ক উন্মুক্ত রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতা-সব মিলিয়ে দিবসটির পরিসর এবার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে বিস্তৃত। এই আয়োজনের সঙ্গে ইতিহাসভিত্তিক নাগরিক শিক্ষা যুক্ত করা জরুরি। পাঠ্যপুস্তক, জাদুঘর, গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রামাণ্য নথি সহজলভ্য করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম দলীয় প্রচার নয়, যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অতীতকে বুঝতে পারে। রাষ্ট্রীয় দিবস পালনের মানদণ্ড হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তি; কোনো নাগরিক যেন রাজনৈতিক পরিচয় বা মতের কারণে নিজেকে এই স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন।
তবে ৭ নভেম্বরের ইতিহাসকে একমাত্রিক বয়ানে সীমাবদ্ধ করা সমীচীন নয়। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বরের পালাবদল, জাতীয় চার নেতার কারাগারে হত্যাকাণ্ড, সেনানিবাসে বিদ্রোহ, জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনাপ্রবাহ পরস্পর জড়িত। এসব ঘটনার ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নে রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে। বিএনপি দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলে, জাসদ বলে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস; অন্যদের কাছে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডও স্মরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো পক্ষের স্মৃতিকে মুছে দেওয়া নয়, আবার রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইতিহাসকে একপেশে করাও নয়। দলিল, গবেষণা ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসচর্চা এবং সব হত্যাকাণ্ডের ন্যায়সংগত বিচারই পারে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ কমাতে।
১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০ ও ২০২৪- প্রতিটি বাঁকেই জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও রাষ্ট্রের স্বাধীন সত্তার প্রশ্ন সামনে এসেছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের চেতনা কেবল স্লোগানে টেকে না; তা টেকে কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নিরপেক্ষ নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং পেশাদার, সংবিধাননিষ্ঠ সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে। সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে রাখা এবং বেসামরিক কর্তৃত্বের সাংবিধানিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত।
অতএব, জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকে বাস্তব রূপ দিতে সরকারকে বিরোধী মতের নিরাপত্তা, সভা-সমাবেশের অধিকার, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদকে বিতর্ক ও সমাধানের প্রধান মঞ্চ করতে হবে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। ইতিহাসের নামে প্রতিহিংসা নয়, সত্যের স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার চাই। ৭ নভেম্বরের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা হোক-রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, জনগণের। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ তখনই অর্থবহ হবে, যখন সবার আগে থাকবে নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভোটের স্বাধীনতা।
সানা/আপ্র/৮/১১/২০২৬