বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অলংকার নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অথচ বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় থাকার রাজনীতিতে এই মৌলিক সত্যটি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। ক্ষমতার বাইরে থাকলে রাজনীতিবিদেরা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার হন; কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁদের অনেকের আচরণে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যায় না। এই দ্বিচারিতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে একটি স্বাধীন, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
সম্প্রতি সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যমের মালিক কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের আগে সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যের খবর নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনায় গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সাংবাদিকদের হয়রানি প্রতিরোধ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, লিখিত নোটিশ এবং কনটেন্ট অপসারণের কারণ জানানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় এসেছে। মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন করা, সাইবার বুলিং, গুজব ও অপতথ্যের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। মোবাইল কোর্টের বিধান না রাখা এবং ব্লক করা কনটেন্ট অবমুক্তির আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও আশাব্যঞ্জক।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নীতিগত ঐকমত্যের সঙ্গে বাস্তব প্রশাসনিক আচরণের মিল কতটুকু? যে দিন সকালে ডিবিসি কার্যালয় থেকে সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে যায় এবং কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে গ্রেফতার করে, সেই একই দিনে সাংবাদিকদের গ্রেফতারে আদালতের পূর্বানুমতির বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থানের খবর সামনে আসা গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। সরকার একদিকে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার আশ্বাস দেবে, অন্যদিকে সাংবাদিককে গ্রেফতারের ঘটনায় সেই আশ্বাসের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে-এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আইন প্রণয়নের আলোচনা যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আইনের শাসন ও প্রশাসনিক আচরণে সেই নীতির প্রতিফলন।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান বিচার করতে হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বাস্তব কর্মকাণ্ড দিয়ে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ও স্পষ্ট করা জরুরি: ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়ার কথা জানানো হলেও পরে যাত্রাবাড়ীর একটি হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ফলে তাঁকে গ্রেফতারের আইনগত ভিত্তি এবং সংবাদ প্রচারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডিবিসি কার্যালয়ে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা সরকারের দায়িত্ব। অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও বিচার হবে, কিন্তু সেটি যেন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত করার দৃষ্টান্তে পরিণত না হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সংবাদমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, আবার সরকারের প্রচারযন্ত্রও নয়। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ক্ষমতাচর্চা, প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সংবাদে ভুল থাকলে প্রতিবাদ, সংশোধন, মানহানির দেওয়ানি প্রতিকার কিংবা নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের কারণে গ্রেফতার, ভয়ভীতি, হয়রানি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। সংবাদমাধ্যমের হাতে কলম রেখে পায়ে বেড়ি পরিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশ প্রতিষ্ঠার দাবি স্ববিরোধী।
বাংলাদেশের জন্য কোন রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুসরণীয়, সেই প্রশ্নেও আবেগের পরিবর্তে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আমাদের সুপারিশ হবে, জার্মানির সাংবিধানিক গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিভাজন, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার কাঠামোর সঙ্গে নরডিক দেশগুলোর কল্যাণরাষ্ট্রের নীতি সমন্বয় করা। সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্কের মতো রাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদাকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তবে কোনো দেশের ব্যবস্থা হুবহু অনুকরণ নয়; বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
এ জন্য সংবিধানপ্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কার্যকর সুরক্ষা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন এবং গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে সাংবাদিকদের গ্রেফতারে আদালতের পূর্বানুমতির বিধান শুধু নীতিগত ঐকমত্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা রক্ষায় স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার মানে কেবল নির্বাচনের আয়োজন নয়; ভিন্নমতকে সম্মান করা, সমালোচনা সহ্য করা এবং ক্ষমতাকে আইনের অধীন রাখা। অতীতের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং তার স্থায়ী অবসানই হওয়া উচিত নতুন রাষ্ট্রচিন্তার লক্ষ্য। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও স্বাধীনতার প্রশ্নে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না। কারণ সাংবাদিকের কলম স্বাধীন না হলে নাগরিকের কণ্ঠও স্বাধীন থাকে না। আর নাগরিকের কণ্ঠ রুদ্ধ রেখে কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী হতে পারে না।
সানা/আপ্র/৭/১১/২০২৬